আইন (Law) বনাম প্রথা(Custom)কোনটির গুরুত্ব বেশি?
সামাজিক জীবনে আমরা অনেককেই বলতে দেখি- সারাজীবন এটা শুনে আসছি, এটা করে আসছি তখন আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘ আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়, অনেক সময় বই বের করেও সেটা দেখাতে হয়। কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষ প্রথা (Custom) কে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে সেটা নির্ভর করে প্রসঙ্গ ও পরিস্থিতির উপর।
আইন (Law):
আইন রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত ও কার্যকর করা হয়। যা ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধান থাকে। এটি আদালত বা প্রশাসন দ্বারা বাস্তবায়িত হয়।
সামাজিক শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত আইনকে সর্বোচ্চ ধরা হয়।
প্রথা (Custom/Tradition):
সমাজের দীর্ঘদিনের অভ্যাস বা সংস্কৃতি।
লিখিত নাও হতে পারে, কিন্তু সামাজিকভাবে মানা হয়। শাস্তি সাধারণত সামাজিক (বিরূপ প্রতিক্রিয়া, বর্জন, সম্মানহানি ইত্যাদি) অনেক সময় আইন তৈরি হয় প্রথার ভিত্তিতেই।
গুরুত্বের দিক থেকে:
রাষ্ট্রীয়ভাবে ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে আইন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামাজিকভাবে প্রথা অনেক সময় বেশি প্রভাবশালী হয়—বিশেষত গ্রামীণ বা অনানুষ্ঠানিক সমাজে। আদর্শ অবস্থায় আইন ও প্রথা একে অপরকে সমর্থন করে চলে। কিন্তু যদি আইন ও প্রথার মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়, তবে আইনের প্রাধান্যই বহাল থাকে,
আমি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে (যেমন বিয়ে, উত্তরাধিকার, গ্রামীণ সমাজ) উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
১. বিয়ে (Marriage)
প্রথা: অনেক জায়গায় এখনও কনের বয়স ১৮’র কম হলেও বিয়ে দিয়ে দেয় পরিবার। কারণ সমাজে এটাই “স্বাভাবিক” নিয়মে চলছে।
আইন: বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এখানে প্রথা সমাজে শক্তিশালী হলেও আইনের চোখে এটা অবৈধ।
এছাড়া সমাজে প্রচলন আছে মেয়ে তালাক দিলে দেনমোহরের টাকা দিতে হবে না! অথচয় রাষ্ট্রীয় ও মুসলিম আইনেও স্পষ্ট বিবাহ করার সাথে সাথে দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে হয় আপনি করছেন না মানে বাকী রাখছেন অত্রএব যেই পক্ষই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটায় বা উদ্যোগ নেয় স্ত্রী দেনমোহরের হক মাফ পাওয়ার সুযোগ নাই। কিন্তু সামাজিক ভাবে দেনমোহরের পুরো টাকা পরিশোধের রায় খুব কম সমাজপতিরা দেয়।
২. উত্তরাধিকার (Inheritance):
প্রথা: অনেক পরিবারে মেয়েরা জমি বা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়, কারন “মেয়েরা স্বামীর বাড়ি চলে যাবে”।
যদি দিতে রাজিও হয় সেক্ষেত্রে সবচেয়ে নিন্ম মানের সম্পত্তি দিয়ে কোনো রকম বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রচলন আরো বেশী ই আছে যে মেয়ে পিতার পৈত্রিক ভিটার অংশ পাবেই না পাবে নাল ডোবায়। এমন ভাবে উপস্থাপন করা যেনো এটাই আইন। ধর্মীয় সকল ইবাদতের মতো বোনের সম্পত্তি এটা বুঝিয়ে দেওয়াও একটা ইবাদত।
আইন: মুসলিম উত্তরাধিকার আইন বা দেওয়ানি আইন অনুযায়ী মেয়ে তার প্রাপ্য অংশ অবশ্যই পাবে।
সমাজে প্রথার কারণে মেয়েরা অনেক সময় বঞ্চিত হয়, কিন্তু আইনের অধীনে তার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।
৩. গ্রামীণ সমাজে সালিশ (Village Arbitration)
প্রথা: গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা “পঞ্চায়েত” বসিয়ে রায় দিয়ে দেয়, যেমন- জরিমানা, সামাজিক শাস্তি, এমনকি অমানবিক শাস্তি পর্যন্ত।
আইন: এ ধরনের “সালিশি রায়” যদি মানবাধিকার বা আইনের পরিপন্থী হয়, তবে তা অবৈধ। আদালতই চূড়ান্ত বিচারক।
বাস্তবে মানুষ সালিশকে দ্রুত সমাধানের উপায় মনে করে, কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে আদালতের রায়ই চূড়ান্ত।
আমাদের আদালতে কিছু বিচার আইনকে এড়িয়ে প্রাথমিকভাবে প্রথাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
উদাহরন হিসেবে টাকা পয়সা লেনদেন বা ধার দেনার মামলায় আমাদের বিজ্ঞ আদালত আসামীর জামিনের ক্ষেত্রে জামিন যোগ্য বিষয়ে প্রথাগত কারনে জামিন অযোগ্য ধারার মতো জামিন দিতে কৃপণতা দেখায় অর্থাৎ বাদীর পক্ষ নিয়ে টাকা উত্তোলনের দায়িত্ব নেয়।
যেমন আমরা কাউকে টাকা ধার দেই, সুদের উপর টাকা দেয়, ব্যবসার উপর টাকা খাটাতে গিয়ে স্ট্যাম্পে চুক্তপত্র করে কিন্তু এই স্ট্যাম্পের চুক্তি অনুযায়ী আদালতে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৫০৬ ধারায় মামলা দায়ের করেন। আইনের স্বার্থের উদ্দেশ্য নিশ্চিত করে চুক্তিবদ্ধ হইলে সেখানে সরল বিশ্বাস থাকে না সেক্ষেত্রে ৪০৬ ধারা আকৃষ্ট করে না। কিন্তু বিজ্ঞ আদালতে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৫০৬ ধারায় আমলে নেয় কারন ৪০৬ জামিন অযোগ্য ধারা সেক্ষেত্রে চার্জ গঠন শুধু ৪২০ ধারাতেই করে। কিন্তু ৪০৬ ধারার চাপ দিয়েই বাদীকে টাকা উত্তোলন করে দেয় এটাই আদালতের ক্ষেত্র বিশেষ প্রথা।
আমি আমার ওকালতি থেকে একটি উদাহরণ দেই, আমি একজন আসামী পক্ষে মামলা পরিচালনা করছি যার বিরুদ্ধে বাদী মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ সালের ৬/৭/৮/৯/১০ ধারায় মামলা দায়ের করেন। যেক্ষেত্রে বাদীর ছেলে লিবিয়া হয়ে গেম খেলে আসামির মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালিতে যাবে। প্রথমত এটা যেহেতু আইনগত ভাবে অবৈধ ভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া সেহেতু উভয় এই অপরাধে দন্ডিত হইবে কিন্তু এক্ষেত্রে আদালত শুধু আসামিকেই বিচারের আওতায় আনে। ভিকটিমরা জীবনের ঝুকি নিয়েই মৌখিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় কিন্তু যেতে ব্যর্থ হলেই মামলা ঠুকে দেয়। যদিও মানব প্রাচারের সংজ্ঞা অনুসারে এ ধারা গুলো ঘটনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, শুধু প্ররোচনার সূরে বিচারের কাঠ গড়ায় শুধু যিনি ভিকটিমকে বিদেশে পাঠানোর দায়িত্ব নিয়েছে। আদালত এক্ষত্রের জামিনে খুবই কৃপণতা দেখায়, এটাই প্রথার প্যাক্টিস।
সারসংক্ষেপ:
সমাজে প্রথা অনেক সময় কার্যকর মনে হলেও আইনের গুরুত্ব সবসময় বেশি। তবে বাস্তবে আইন প্রয়োগ দুর্বল হলে প্রথাই অনেক জায়গায় মানুষকে চালিত নেয়।
আইন বনাম প্রথা পার্থক্যটা তালিকা আকারে দিলাম:
বিষয় আইন (Law) প্রথা (Custom/Tradition)
সংজ্ঞা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত ও লিখিত নিয়মকানুন সমাজের দীর্ঘদিনের অভ্যাস, সংস্কৃতি বা রীতি
কার্যকর করার ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান (আদালত, পুলিশ, প্রশাসন) দ্বারা প্রয়োগ হয় সামাজিক চাপ, সম্মান-অপমান, বর্জন দ্বারা প্রয়োগ হয়। শাস্তি আইনি শাস্তি (জরিমানা, কারাদণ্ড ইত্যাদি) সামাজিক শাস্তি (সমালোচনা, বর্জন, লজ্জা ইত্যাদি)
স্থিতিশীলতা সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল (সংসদে সংশোধন হয়) সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, পরিবর্তন ধীরগতির, উদাহরণ- (বাংলাদেশে) বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ, নারীর উত্তরাধিকার অধিকার নিশ্চিত কম বয়সে বিয়ে দেওয়া, মেয়েদের জমি থেকে বঞ্চিত করা, প্রাধান্য আইন ভঙ্গ করলে রাষ্ট্রীয় শাস্তি হবে, তাই আইনের প্রাধান্য বেশি সমাজে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রথা অনেক সময় বেশি প্রভাব ফেলে
মূর্দা কথা-
রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনই সর্বোচ্চ।
কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে প্রথা অনেক সময় মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
সঠিক সমাজ গঠনের জন্য আইন ও প্রথার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।
লেখক-
গাজী ফয়সাল ইসলাম
এডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ)
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ