বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে দেশি ও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে ২০ বছর মেয়াদি ‘সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫–২০৪৫)’।

এটি কোনো প্রচলিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং সুন্দরবনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত রেখে টেকসই পর্যটন বাস্তবায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।

মাস্টারপ্ল্যানটি বন বিভাগ অনুমোদন করলে ইউনেস্কো ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে, এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কে করছে এই পরিকল্পনা-

ইউএসএআইডি’র আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় বাংলাদেশ বন বিভাগ ও সোলিমার ইন্টারন্যাশনাল এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। প্রকল্পটি ইউএসএআইডি ইকোট্যুরিজম অ্যাক্টিভিটি পাইলট প্রকল্পের অংশ, যার প্রথম ধাপে তিন বছর মেয়াদে মাস্টারপ্ল্যানের বড় অংশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।

এই প্রকল্পের ডেপুটি চিফ অব পার্টি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম।

তিনি জানান, “দুই বছর ধরে পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে। এটি সুন্দরবনের পরিবেশ ও অর্থনীতির সমন্বয়ে তৈরি একটি টেকনিক্যাল রোডম্যাপ। বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় অর্থনীতি মজবুত হবে এবং বন সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।”

বৈদেশিক মুদ্রা ও স্থানীয় উন্নয়ন-

ড. ওয়াসিউল বলেন, “সুন্দরবনে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথ খুলবে। বিদেশিরা সুন্দরবনের শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে বিশেষ আগ্রহী। এই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে পর্যটন খাত জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।”

পরিকল্পনাটিতে কমিউনিটি-ভিত্তিক ইকোট্যুরিজম মডেল যুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, ট্যুরিস্ট পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ট্যুর অপারেটরদের মতামত নিয়ে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হয়।

মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান-

পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জীবিকা সৃষ্টি করা। এতে স্থানীয়রা পর্যটনের মাধ্যমে আয় করতে পারবে, বনাঞ্চলের ওপর চাপ কমবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সহনশীলতাও বাড়বে।

ইতিমধ্যে ২০০ জনের বেশি ইকো-গাইডকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা পর্যটকদের সেবা দেবে এবং মানুষ–বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমাবে। পাশাপাশি দাকোপ এলাকায় স্থাপিত ইকো-কটেজে কর্মরত স্থানীয় কর্মচারীদেরও পর্যটক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

নতুন সুযোগ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা-

মাস্টারপ্ল্যানে পর্যটকদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য তিনটি প্রবেশপথ— মোংলা, মুন্সিগঞ্জ ও শরণখোলা এলাকায় তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে পর্যটকরা নৌকা ভাড়া, ইকো-গাইড নিয়োগ ও কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবা নিতে পারবেন।

বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ পর্যটক সুন্দরবনে যান। এ বিপুল সংখ্যক পর্যটককে নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা বড় চ্যালেঞ্জ। এই মাস্টারপ্ল্যান পরিবেশের ক্ষতি না করে দায়িত্বশীল পর্যটনকে উৎসাহিত করবে।”

তিনি জানান, পরিকল্পনাটি বর্তমানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বাস্তবায়িত হলে খুলনাভিত্তিক ইকোট্যুরিজম জাতীয় রাজস্বের বড় উৎসে পরিণত হবে।

গ্রামীণ আশাবাদ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা-

সুন্দরবনের আশপাশের গ্রামবাসীরাও পরিকল্পনাটি নিয়ে আশাবাদী। তারা বলছেন, আগে কিছু ব্যক্তিগত কটেজে অনিয়ম থাকলেও এখন সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনকল্যাণ দুই-ই নিশ্চিত হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০ বছর মেয়াদি এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবন হবে টেকসই পর্যটনের বৈশ্বিক উদাহরণ, যা একদিকে বন সংরক্ষণে সহায়ক হবে, অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে।