ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ ফেব্রুয়ারি মাসেই আয়োজন করতে হবে বলে দাবি জানিয়েছে একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও প্রেস কনফারেন্সের সভাপতি আবুল বাসার ফিরোজ শেখ।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের ‘তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদের আয়োজনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা খন্দকার শাহ আলম। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক মফিজুর রহমান লালটু।
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘অমর একুশের গ্রন্থমেলা’ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। লেখক, পাঠক, প্রকাশকদের পক্ষ থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই – একুশের বইমেলা জনগণের বইমেলা। জন-আকাঙ্খা পদদলিত করার শক্তি পৃথিবীর কেউ রাখে না। আমাদের প্রাণের বইমেলাও কেউ বন্ধ করে দিতে পারবে না। প্রয়োজনে আমরা রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বার হবো, প্রয়োজনে বুকের রক্ত ঢেলে দেব কিন্তু আমাদের জাতিসত্ত্বার প্রতীক একুশের বইমেলা বন্ধ করতে দেব না। সরকার বলেছে, নির্বাচনের কারণে তারা নিরাপত্তা দিতে পারবে না। এদেশের জনগণকে কোন সরকারই নিরাপত্তা দিতে পারেনি বরং জনগণই তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে এবং নিরাপত্তা দিয়েছে। জনগণ যখনই চেয়েছে সরকারকে বিদায় নিতে হয়েছে। যেমন, হাসিনাসহ অতীতের সব স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্টদের বিদায় নিতে হয়েছে। নির্বাচন থাকবে নির্বাচনের যায়গায়। বইমেলা থাকবে বইমেলার যায়গায়। হ্যা, কিছু মানুষ নির্বাচন করতে বাড়ি যাবে। ঢাকায় কি মানুষ থাকবে না? বরং আমি মনে করি বইমেলায় প্রার্থীরা নির্বাচনের প্রচার চালাতে পারবে। যে বইমেলা আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি তথা জীবনকে বিকশিত করে আমরা সেই প্রেরণার উৎসকে বন্ধ হতে দেব না। আমরা যেকোন মূল্যে যেকোনভাবে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা করব। ৪ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারকে আল্টিমেটাম দিচ্ছি–এর মধ্য আমাদের দাবি মানতে হবে। না হলে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ী থাকবে। আমাদের লাশের উপর দিয়ে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ বন্ধ করতে হবে। তার বাইরে আর কিছু হবে না।”
তিনি অমর একুশের বইমেলা বন্ধের ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
এডর্ন প্রাকাশনীর প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, আমরা একুশে বইমেলা একুশের ফেব্রুয়ারিতেই চাই।” উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন বলেন, চার তারিখের মধ্যে বইমেলার ঘোষণা না এলে আমরা পাঁচ তারিখে প্রধান উপদেষ্টার কাছে যাব এবং স্মারকলিপি দেব।” কবি কামরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, আমাদের আজকের প্রতিবাদ থেকে আবারও ঘোষণা করতে চাই, আমরা কোনভাবেই বইমেলা ব্যর্থ হতে দেব না। এটাকে এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই।”
লিখিত বক্তব্যে শাহ আলম বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করলাম, অন্তর্বর্তী সরকার অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে। সরকারের এরূপ সিদ্ধান্ত দেশের হাজার হাজার লেখক, পাঠক, প্রকাশক, সংস্কৃতিকর্মীসহ ব্যাপক জনগণকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। একুশের বইমেলা এদেশের মানুষের স্বাধীনতা-স্বাধীকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় তা আজ বিশ্বপরিসরেও প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচিতি লাভ করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া সেই মর্যাদা ও গুরুত্বকে তুলে ধরে। একুশের বইমেলা জাতীয় পর্যায়ে এদেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল উৎসব। জাতি ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ শ্রেণী নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্য বৈচিত্রপূর্ণ ও অসম্প্রদায়িক মিলনস্থল হিসাবে তা আজ খুবই জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বইমেলাকে ঘিরে ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণ ও স্বত:স্ফূর্ত উপস্থিতিতে এক আনন্দময় সাংস্কৃতিক পরিবেশ, সৃজনশীল কর্মতৎপরতা এবং উদ্দীপনাময় নানা আয়োজন সংঘটিত হয়ে থাকে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা স্থগিতের কারণ হিসাবে কর্তৃপক্ষ জাতীয় নির্বাচন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছেন। জাতীয় নির্বাচন দেশের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নাই, কিন্তু আমরা মনে করি নির্বাচনের পরিবেশ এবং আইন শৃঙ্খলার অজুহাতে কোনক্রমেই একুশের বইমেলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত নয়। বইমেলায় পাঠকের আগমন ও উপস্থিতি কোনভাবেই নির্বাচনের পরিবেশে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না। ইতোপূর্বে ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের নজির রয়েছে, পবিত্র রমজান মাসেও বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সে সময় বইমেলা স্থগিতের কোন ঘটনা ঘটেনি, প্রশ্নও উঠেনি। জাতীয় নির্বাচন দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়, আর বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ঢাকার এক অতিক্ষুদ্র পরিসরে। সূতরাং নিরাপত্তার অজুহাতটি ধোপে টেকে না। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চুড়ান্ত তফসিল এখনো ঘোষিত হয় নি। একুশে বইমেলার মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ধার্য্য হলে মেলা কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের দিন বইমেলা বন্ধ রাখতে পারেন। প্রয়োজনে নির্বাচনের আগের দিন এবং পরের দিনও বইমেলা বন্ধ থাকতে পারে। দেশবাসি বেদনার সাথে লক্ষ্য করছে যে, সরকারের পক্ষ থেকে বইমেলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে অথচ অনেক বড় পরিসরের বাণিজ্যমেলা আয়োজনে কোনো অসুবিধার কথা শোনা যায় নি। ফলে স্বাভাবিকভাবে জনমনে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, বইমেলার মত মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার সৃজনশীল ক্ষেত্রটিকে সংকুচিত করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে সরকারের মধ্যে অবস্থানকারী সেই শক্তি সিদ্ধান্তটি নিয়েছে; যে শক্তি বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও অসম্প্রদায়িক চেতনাকে গ্রহণ করতে পারে না, যারা জনগণের মাঝে সাম্প্রদায়িক, কূপ-মন্ডূক ও অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোজগৎ সৃষ্টি করতে চায় এবং স্বাধীনতার চেতনা ও আবহমান সংস্কৃতি বিরোধী। এই শক্তিই একুশের বইমেলা নস্যাৎ করার অপতৎপরতা চালাচ্ছে বলে আমরা মনে করি।
প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কন্ঠের সম্পাদক কবি ও সংবাদিক হাসান হাফিজ বলেন, আমি তো মনে করি সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশন দরকার। সরকারের কেন যেন সোজা আঙুলে ঘি উঠছে না। সরকার কি করছে বুঝি না। তারা এক বছর ধরে নির্বাচন করতে পারছে না। ভয়ংকর দৈন্য অবস্থায় পড়েছে। রোজায় কি অফিস আলাদত বন্ধ থাকে? মেলা হোক। সরকারকে আহৃবান জানাব সময় থাকতে মেলা হোক।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন– প্রগতি লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবি হাসান ফখরী, প্রকাশক আলমগীর শিকদার লোটন, দেলওয়ার হোসেন, জাতীয় কবিতা পরিষদের কবি লিলি হক, কবি কৌমুদী নার্গিস, কবি রফিক চৌধুরী, কবি টিমুনী খান রীনো, কবি সবুজ মনির, কবি তাসকিনা ইয়াসমিন, সাংবাদিক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্নাসহ প্রায় শতাধিক লেখক, কবি, সাংবাদিক, প্রকাশক, সংস্কৃতিকর্মী ও মুক্তচিন্তার মানুষ।
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫, ১:০২ অপরাহ্ণ