ম্যাকলিন চাকমার জম্ম ও বেড়ে ওঠা পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার সুবলঙের হাজাছড়া গ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করা ম্যাকলিনের লেখায় ফুটে ওঠে পাহাড়ি জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবনবোধের নানাদিক। তার লেখা “নুও গোরি ফাগুন এঝের” বইটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বাংলা বিভাগের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সাহিত্য কোর্সে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। নিজের পড়াশোনা,সাহিত্য, সংগ্রামী জীবনের নানাদিক নিয়ে কথা বলেছেন খবরবেলার সাথে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরবেলার নির্বাহী সম্পাদক রেফায়েত উল্যাহ রুপক।

খবরবেলা : কেমন আছেন?

ম্যাকলিন চাকমা : জ্বি, আমি ভালো আছি।

খবরবেলা : আপনার শৈশবে বেড়ে ওঠার গল্প কেমন ছিল?

ম্যাকলিন চাকমা : আমার জন্ম পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলায় বরকল উপজেলার সুবলঙের হাজাছড়া গ্রামে। আমার গ্রাম সুবলং হাজাছড়ায় হলেও বিশেষ কারনে শৈশবের বেশির ভাগ সময় কেটেছে বরকল উপজেলার মিজোরাম সীমান্তবর্তী হরিণা পাহাড়ে।

খবরবেলা : পাহাড়ের জীবন কতটা সংগ্রামময় ছিল আপনার জন্য?

ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ের জীবন অনেক সংগ্রামের। এখানে প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই টিকে থাকতে হয়।পাহাড়ের মানুষ মূলধারার জনগোষ্ঠী থেকে অনেক পিছিয়ে। অনেকক্ষেত্রে শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চা হয় মুষ্টিমেয়। সরকার যদি পাহাড়িদের অধিকার, সংস্কৃতি, সাহিত্য চর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা করে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ আরও অনেক এগিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

খবরবেলা : আপনার পড়াশোনার শুরুটা কিভাবে ?

ম্যাকলিন চাকমা : আমি প্রথম মায়ের হাত ধরে আমার গ্রামের ৪৬ নং হাজাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০০১ সালে ১ম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার দূরে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে ২০১০ সালে ৯ম শ্রেণিতে পাহাড়ের বাতিঘর খ্যাত মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে (বর্তমানে মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় স্কুল এ্যান্ড কলেজ) ভর্তি হই। এরপর ঢাকার মার্টিন লুথার কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি সাহিত্যে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করি।

খবরবেলা : বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা পর্যন্ত আপনি কি কি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ে লেখাপড়ার বাস্তবতা একটু ভিন্ন। মূলধারার সাথে তুলনা করলে পাহাড়ে শিক্ষা ব্যবস্থা যোজন যোজন পিছিয়ে। শিক্ষক নিয়োগে দূর্নীতি এর বড় অন্তরায়। তবে আরও কয়েকটা কারণ আছে। দুর্গম এলাকা, স্কুল সংকট এগুলো অন্যতম।
আমি যখন প্রথম শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত গ্রামে থেকেই লেখাপড়া করি, তখন আমার বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় ২-৩ কিলোমিটারের দূরে ছিল। নৌকায় করে স্কুলে যেতে হতো। তারপর আমার বাবা-মা মোনঘরের (পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিনিকেতন হিসেবে পরিচিত) সন্ধান পেলেন। মোনঘরে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। তখন থেকেই আমার লেখাপড়ায় কিছু গতি এলো। আর লেখালেখি তো মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে এসেই শুরু করেছিলাম।

খবরবেলা : আপনার এতদূর আসার পিছনে আপনার মায়ের সংগ্রামের গল্প শোনা যায়, সেটি কেমন ?

ম্যাকলিন চাকমা : ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে মা তখন কৈশোরের সময় পার করছেন ঠিক সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। তখন আমার মাকে রাঙ্গামাটি ছেড়ে ভারতের মিজোরামে উদ্বাস্তু জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছিল। দীর্ঘদিন মায়ের পরিবার মিজোরামে থাকার পর পরিস্থিতি যখন কিছুটা বদলাতে থাকে তখন মা এবং তার পরিবার বাংলাদেশে চলে আসে। তারপর মায়ের বিয়ে হলো বাবার সাথে। ঠিক তারপর থেকেই পরিবার নিয়ে আবার মায়ের সংগ্রাম শুরু। বাবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। তিনি আমাদের বলতেন, জীবনে যতই বাঁধা আসুক লেখাপড়া চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মানুষের মতো মানুষ হতে হবে।

খবরবেলা : কখন আপনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন?

ম্যাকলিন চাকমা : আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে পালি বিভাগে ভর্তি হই। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছি।

খবরবেলা : পাহাড়ি জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি কিভাবে আপনার সাহিত্যে প্রভাব ফেলে বা ফুটে উঠে?

ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ের সংগ্রামী জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সাথে আমার নিবিড় সম্পর্ক আছে। আমার সাহিত্য চর্চার প্রাণকেন্দ্র হলো পাহাড়। আমি খুব কাছ থেকে পাহাড়ের বাস্তবতা, পাহাড়ি মানুষের সংগ্রামী জীবন দেখেছি।  বাস্তবতা হলো এই, আমার জীবনের বেশিরভাগ শৈশব কেটেছে বরকলের ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা হরিণামৌনের পাহাড়ে। তখন আমার নানা-নানিরা হরিণা পাহাড়ে জুম চাষ করতেন। আমরাও তাদের সাথে কয়েক বছর জুমচাষ করেছিলাম। আমি তখন ছোট। তখন থেকেই পাহাড়কে রূপসী, সংগ্রামী, প্রেমিকা হিসেবে কল্পনা করা শুরু করি। পাহাড়ি জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আমার জীবনবোধের একটা অংশ। এখানে কোনোটিই বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। পাহাড় সম্পর্কে লিখতে গেলে এগুলো বারংবার চলে আসে। তাই আমার সাহিত্য চর্চার বড় অংশ জুড়ে এই পাহাড়ের মানুষদের জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বিদ্যমান।

খবরবেলা : নিজের সাহিত্যচর্চা নিয়ে আপনার ভাবনা কি?

ম্যাকলিন চাকমা : আমার ইতিমধ্যেই চাকমা ভাষায় তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। চাকমা ভাষায় কবিতা লেখার পাশাপাশি বাংলায়ও কবিতা লিখছি। পাশাপাশি চাকমা ভাষায় ছোটগল্প, গানও লিখছি। আমার সাহিত্য চর্চা এভাবেই অব্যাহত রাখতে চাই।

খবরবেলা : আপনার একটি বই ইবির পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি কখন, কিভাবে হলো ?

ম্যাকলিন চাকমা : ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল স্যার ২০২৩ সালে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে আমাকে কল দিয়ে জানালেন, ম্যাকলিন আপনার ‘‘নুও গোরি ফাগুন এঝের’’ বইটি বাংলা বিভাগের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সাহিত্য কোর্সে অনুসরণীয় বইয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তরুণ বয়সে এত বড় অর্জন আমার জন্য পরম পাওয়া। আমার আরও দায়বদ্ধতা বেড়ে গেলো এই ভেবে খুশি হলাম। দীর্ঘ আলাপ শেষে উনাকে কৃতজ্ঞতা জানালাম।

ইবির একজন পাহাড়ি শিক্ষার্থীর মাধ্যমে রেজাউল স্যার আমার সাহিত্য চর্চা সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে উনার সাথে ফোনে কথোপকথন হয়। তিনি বলেন, ইবিতে বাংলা বিভাগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সাহিত্য নামক একটি কোর্স চালু হতে যাচ্ছে। আদিবাসীদের সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে বাঙালিরা বিশদভাবে জানুক এটাই এর উদ্দেশ্য। আর তিনি এ বিষয়ে কাজ করছেন।

খবরবেলা : আপনি সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথেও জড়িত। কিভাবে এসব কাজ পরিচালনা করছেন?

ম্যাকলিন চাকমা : কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে কাজ করেছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সাহিত্য প্রকাশনা রঁদেভূ ১৭তম সংখ্যা সম্পাদনা সহ বিভিন্ন সাহিত্য কাগজে কাজ করেছি এবং বর্তমানেও করছি। বর্তমানে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রাইটার্স ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহ-গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি।

খবরবেলা : ভবিষ্যতে পাহাড়ি মানুষ এবং বাংলাদেশের জন্য কি করতে চান?

ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ের জনগণ তাঁদের অধিকার, স্বকীয়তা, ভূমি, সংস্কৃতি, সাহিত্য নিয়ে গৌরবের সাথে এদেশের বুকে বেঁচে থাকতে চায়। আর আমিও চাই পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ তাঁদের অধিকার নিয়ে বাঁচুক। আমার স্বপ্ন অনেক। আমি সাহিত্য জগতের মানুষ। সাহিত্য নিয়েই আজীবন থাকার ইচ্ছে আছে। আমি যখন লেখালেখি শুরু করি আমার উদ্দেশ্যই ছিল চাকমা ভাষাকে সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। চাকমা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে সাহিত্যের মাধ্যমে তুলে ধরতে চাই। আমি সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে চাকমা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। আর সুযোগ পেলে বাংলাদেশের জন্যও কাজ করতে চাই। বাংলাদেশ বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যের দেশ। এদেশের জন্য কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। যদি কাজ করার সুযোগ আসে অবশ্যই দেশের জন্য যেকোনো মঙ্গলজনক কাজ করতে চাই।

খবরবেলা : আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আপনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, এর অভিজ্ঞতা কেমন?

ম্যাকলিন চাকমা : ২০২৩ সালে জুন মাসে অনলাইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে একবার অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। কানাডা,চীন,গ্রীস,ইরান,ফিলিপাইন, সার্বিয়া থেকে খ্যাতিমান কবিরা এই কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করি। সেখানে বাংলাদেশ এবং পাহাড়ি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছি।

খবরবেলা : আমাদের সাথে যুক্ত হওয়ায় আপনাকে ধন্যবাদ।

ম্যাকলিন চাকমা : খবরবেলাকেও অনেক ধন্যবাদ আমার কথাগুলো শোনার জন্য।