লাল রক্তে রাঙানো এক ডিসেম্বরের সকালে জন্ম নিয়েছিল একটি দেশ—বাংলাদেশ। এই স্বাধীনতা কোনো হঠাৎ প্রাপ্তি নয়; এটি এসেছিল তরুণদের অদম্য সাহস, বুকের তাজা রক্ত আর সীমাহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে। তখনকার সবুজ শ্যামলের এই ভূখণ্ডে অস্ত্র হাতে, স্বপ্ন বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল হাজারো তরুণ; যাদের চোখে ছিল স্বাধীনতার প্রত্যয়, আর কাঁধে ছিল জাতির ভবিষ্যতের ভার।
‎
‎দীর্ঘ শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে তরুণরাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি। ছাত্র, শ্রমিক, গ্রাম থেকে শহরের সাধারণ যুবকরাই সম্মুখসমরে দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতিকে পৌঁছে দিয়েছিল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। সেই সংগ্রামের পরিণতিতেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। এই দিনেই পৃথিবীর মানচিত্রে স্থায়ীভাবে লেখা হয় একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম—বাংলাদেশ।
‎
‎আজ বিজয়ের ৫৫ বছরে পা দিয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তরুণদের ভূমিকা বদলায়নি—শুধু রূপ বদলেছে। আজকের তরুণেরা অস্ত্র হাতে নয়, চিন্তা, বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ নিয়ে ধারণ করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। প্রতি বছর বিজয় দিবস সেই চেতনাকেই নতুন করে জাগ্রত করে, স্মরণ করিয়ে দেয় ঐক্য, সাহস ও ন্যায্যতার মূল্যবোধ।
‎
‎মহান বিজয় দিবসকে ঘিরে বর্তমান সময়ের তরুণদের সেই ভাবনা, উপলব্ধি ও দায়বদ্ধতার জগৎ তুলে ধরেছেন ‘খবর বেলা’ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রাশেদুল ইসলাম।
‎
‎বিজয়ের এই চেতনা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়
‎
‎ডিসেম্বর মাস এলেই পুরো বছরের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। এই বছরের সফলতা, ব্যর্থতা, পূর্ণতা, অপূর্ণতা—আরও যে কত কী! এই জটিল হিসাব-নিকাশের মাঝে যে ভাবনাটি আমাদের মনে এক প্রশান্তির অনুভূতি এনে দেয়, তা হলো; এই মাসটি ‘বিজয়ের মাস’, বাংলাদেশ নামে এক নতুন ভূখণ্ড অর্জনের মাস।
‎
‎ছোটবেলায় স্কুলজীবনে বিজয় দিবস ছিল একেবারেই অন্যরকম। লম্বা দড়িতে কাগজের ছোট ছোট লাল-সবুজ পতাকা আঠা দিয়ে লাগানো, সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে জাতীয় সংগীত গেয়ে বিজয় দিবস উদ্‌যাপন করা। তখন তো এতো ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি বুঝতাম না। শুধু জানতাম, আমি যে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে ছুটোছুটি করছি, এই পতাকা আমাদের। এটি আমরা অর্জন করেছি।
‎
‎বড় হয়ে বুঝেছি, ১৬ ডিসেম্বর একদিকে যেমন বাঙালির আনন্দের দিন, তেমনি এই দিনটি অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ নয় মাসের আত্মত্যাগ, বাঙালির ঐক্যবদ্ধ চেতনার ইতিহাস, মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর ইতিহাস। এই ইতিহাস আমাকে উদ্দীপ্ত করে এবং এই চেতনা আমাকে মনে করিয়ে দেয়; সব অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মাথানত না করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
‎
‎১৬ ডিসেম্বরের এই বিজয় আমি নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি জুলাই ২৪-এর বিজয়ের মধ্য দিয়ে। জুলাই ২৪-এর বিজয় আমাকে বুঝতে শিখিয়েছে, জীবনের মুক্তির স্বাদ কত সুন্দর, কত আনন্দের। নিজের চোখের সামনে দেখেছি, মুক্তির নেশা মানুষকে কতটা দুঃসাহসী করে; যে দুঃসাহসে সে বুলেটের সামনে নিজের বুক পেতে দিতেও দ্বিধা করে না। বিজয়ের এই চেতনা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। আমাদের বুঝতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেলে একদিন না একদিন ১৬ই ডিসেম্বরের মতো পূর্ব আকাশে লাল সূর্য উদিত হবেই। আর দূরের কোনো মাইক থেকে ভেসে আসবে বিজয়ের গান—
‎
‎পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে
‎রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল।


‎সুলতানা রাজিয়া আশা
‎গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
‎
‎
‎মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইয়ের শহিদের ভাবনার বাস্তবে রূপ চাই
‎
‎১৬-ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস আমাদের ইতিহাস, জয় এবং উল্লাসের দিন। এই আনন্দঘন দিনের পিছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণের তাজা রক্ত এবং বহু আত্মত্যাগ। বিনিময়ে আমাদের চাওয়া ছিল; পরাধীনতার খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়া, নিজের ইচ্ছে মতো দেশ এবং জাতির জন্য বাঁচা, আমার ভোটে আমার শাসক তৈরি করা, আমার পছন্দ মতো গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা।
‎
‎কিন্তু আসলেই কি আমরা তা পূর্ণভাবে অর্জন করেছি? না, আমরা তা পারিনি। আর পারিনি বলেই ৫৪ বছর পরে আবারও ২৪-এর জুলাই-আগস্টের ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে। জুলাই এবং তার পরবর্তী সময় পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধ বা জুলাই গণঅভ্যুত্থান’এর যে মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার অর্ধাংশও বাস্তবিকভাবে কার্যকর হয়নি।
‎
‎তাই এই মহান বিজয় দিবসে আমার চাওয়া হলো; মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাইয়ে শহীদ হওয়া মানুষগুলোর ভাবনাকে আজকের প্রজন্ম বাস্তবায়িত করতে পারে। তাদের ত্যাগ ও স্বপ্নের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রাখা আমাদের দায়িত্ব।
‎
‎

এন. এইচ রনি
‎গণিত বিভাগ
‎
‎
‎চিরন্তন হোক বিজয়ের চেতনা, চিরজয়ী হোক বাংলাদেশ
‎
‎১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এটি শুধু সাময়িক বিজয়ের স্মারক নয়; একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত স্বীকৃতি।
‎
‎বিজয় দিবস আমাদের গৌরবের পাশাপাশি দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ন্যায়, সমতা, মানবিকতা ও গণতন্ত্র; যদি আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে প্রতিফলিত না হয়, তবে বিজয়ের মহাত্ব সংকীর্ণ হয়ে যায়।
‎
‎আমাদের তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব হলো ইতিহাস জানা, বিকৃতির বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে গবেষণা, চিন্তা ও কর্মে ধারণ করা। বিজয় দিবস কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের প্রত্যয় হোক, স্বাধীনতার মূল্যবোধ রক্ষা করে একটি উন্নত, মানবিক ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
‎
‎জান্নাতুল ফেরদৌস আলফি
‎পরিসংখ্যান বিভাগ
‎
‎বিজয়ের মাহাত্ম্যে মহিমান্বিত হোক আমার দেশ
‎
‎বিজয়ের স্বাদ আমরা বাঙালিরা একবার নয়, বহুবার পেয়েছি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে আমরা নিজেদের জাতিসত্তা চিনিয়েছিলাম। কিন্তু সেই বিজয় ছিল অসম্পূর্ণ। এক শাসকের হাত থেকে মুক্ত হয়ে আমরা গিয়ে পড়েছিলাম আরেক শাসকের করাল গ্রাসে।
‎
‎১৯৭১ থেকে ২০২৫, এই দীর্ঘ ৫৪ বছরে একের পর এক শাসকের হাতে দেশ গেলেও আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনি। শাসন বদলেছে, কিন্তু শোষণের রূপ বদলায়নি। ক্ষমতা এসেছে, ক্ষমতা গেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য খুব একটা বদলায়নি। রাষ্ট্র ছিল, কিন্তু ন্যায় ছিল না। স্বাধীনতা ছিল, কিন্তু মর্যাদা ছিল না।
‎
‎সম্প্রতি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান আমাদের মনে নতুন করে স্বপ্ন জাগিয়েছে। আবারও আমরা ভাবতে শুরু করেছি, হয়তো এবার বিজয় শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব জীবনেও ধরা দেবে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে এই বিজয় দিবসে আমার প্রত্যাশা তাই ভিন্ন, গভীর ও বাস্তবমুখী।
‎
‎আমি চাই বিজয়ের মাহাত্ম্য যেন কেবল শহীদ মিনার বা মঞ্চে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা পৌঁছে যাক প্রতিটি বাংলাদেশীর ঘরে। প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হোক। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়—যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক। দু’মুঠো ভাতের জন্য যেন কাউকে অপমানিত হতে না হয়। প্রশাসনে যেন চাটুকারিতা নয়, যোগ্যতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্নীতি যেন আর রাষ্ট্রের স্বাভাবিক সংস্কৃতি না থাকে।
‎
‎সবচেয়ে বড় কথা, আমি চাই আমার দেশ যেন কখনো মাথানত না করে। কেউ যেন চোখ তুলে তাকানোর সাহস না পায়। শত্রুদের কালো হাত আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে পারি। ‘বাংলাদেশ’ নামটি উচ্চারণ করার সময় কেউ দীর্ঘশ্বাস না ফেলে বরং গর্ব ও তৃপ্তির নিশ্বাস নিক। বিজয়ের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রতিটি মানুষ মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাঁচতে পারবে। বিজয়ের মাহাত্ম্যে মহিমান্বিত হোক আমার দেশ, আমার জাতি, আমার রাষ্ট্র, আমার সমাজ এবং আমরা সবাই।
‎
‎আবছার উদ্দিন ইফতি
‎হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ
‎
‎
‎সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই স্বাধীনতার ইতিহাস রক্ষায়
‎
‎কোনো বর্বরতা বাঙালিকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারে নি। ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঝাপিয়ে পড়ে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী—সকল মানুষ। সকল পদ-পদবী ভুলে সবাই এক হয়ে তুলে নেয় নজরুলের রণতুর্য। বাঙালীর সামান্য লাঠিও তখন ব্রহ্মাস্ত্রের ন্যায় প্রলয় তুলে।
‎
‎১৬ই ডিসেম্বর, ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। দীর্ঘ নয় মাস বাংলার বরপুত্ররা হিসেব চুকিয়েছিল অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্য লাঞ্চনার, লড়েছিল মানবতা, ন্যায় বিচার ও স্বাধিকারের পক্ষে। পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আমরা বাঙালীরা পেয়েছিলাম বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা, সার্বভৌমত্ব, আয়তাকার সবুজের মাঝখানে একটি রক্তিম সূর্য, অ আ ক খ নামে নিজস্ব লিপিবর্ণ, এবং পেয়েছি গণতন্ত্রের স্বপ্ন।
‎
‎বিজয় দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল অর্পিত কোনো শব্দ নয়, এটি মহান আত্মত্যাগের ফসল। বিজয় শেখায় দেশের জন্য ব্যক্তিস্বার্থকে বলিদান দিতে। বিজয় দিবস শহীদদের রক্তে লেখা স্বাধীনতার চিরঅম্লান এপিটাফ, যা জাতির ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকুক চিরকাল। এই তারিখটি শুধু স্মরণ নয়; এটি আত্মসমালোচনার দিন, এটি অঙ্গিকারের প্রহর। আসুন, সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই স্বাধীনতার ইতিহাস রক্ষার।
‎
‎সৈয়দা মাহিনুর আক্তার
‎রসায়ন বিভাগ
‎