জনসংযোগ কর্মকর্তা সাধারণত জনসাধারণ এবং গণমাধ্যমের সাথে প্রতিষ্ঠানের হয়ে একটি সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করে থাকেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক বা ভালো দিকগুলো মিডিয়ায় উপস্থাপন করে থাকেন। গণমাধ্যমের সাথে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কটা তাঁর মাধ্যমেই হয়ে থাকে। জনসংযোগ কর্মকর্তাকে ইনহাউজ সাংবাদিক বা প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকও বলা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের ভালো দিকগুলো মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে জানানোই হবে তাঁর কাজ। তিনি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র (স্পোকসপারসন) হিসেবে কাজ করেন। মোদ্দাকথা, তিনি প্রতিষ্ঠান সর্বোপরি প্রতিষ্ঠান প্রধানের প্রেস সচিবের কাজ করেন। মিডিয়াকে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম ও পলিসিগুলো প্রদান করে থাকেন। জনসংযোগ কর্মকর্তার প্রধান কাজ হলো প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি, রক্ষা এবং উন্নত করা।

অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক অংশীজনের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন ও সম্পর্ক রক্ষা করেন। সংবাদ মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি ও বজায় রাখেন। কোনো সংকট বা নেতিবাচক পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য কৌশলগত যোগাযোগ পরিচালনা করেন। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে কোনো বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করতে পারেন। যদিও বাংলাদেশে বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই কালচার এখনো গড়ে ওঠেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে অন্যান্য দেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পদক্ষেপগুলো ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তারা ব্রিফ করে থাকেন। এর মাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি সম্পর্কে সারা পৃথিবী জানতে পারে৷ আর এটাই তাদের কাজ। আমাদের দেশের বর্তমান সরকার প্রধানের প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি প্রধান উপদেষ্টার কার্যক্রম ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমগুলো প্রতিনিয়ত প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানান দিচ্ছেন। আমার জানা মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সরকার প্রধানের প্রেস সচিবদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি মিডিয়াতে আসছেন এবং কথা বলছেন। সাধারণত উন্নত দেশে এমনটাই হয়ে থাকে।

যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তার কাজই হলো প্রতিষ্ঠানের প্রকাশযোগ্য বিষয়গুলো মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করা। আর প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিংটা জনসংযোগের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। কারণ একজন জনসংযোগ কর্মকর্তা যদি প্রতিষ্ঠানের পজিটিভ দিকগুলো প্রচার না করেন, তাহলে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সবার মধ্যে একটা অস্পষ্ট ধারণা তৈরি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানে কি হচ্ছে, সে বিষয়গুলো মানুষ না জানলে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালো ধারণাও হবেনা এবং আগ্রহ তৈরি হবেনা।

পৃথিবীতে তথ্য সবচেয়ে শক্তিশালী। এটি পারমাণবিক বোমার চেয়েও ক্ষমতা বেশি রাখতে পারে। যেকোনো তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আরও বেশি স্বচ্ছতা তৈরি হয়। মানুষ যতবেশি তথ্য জানবে, ততবেশি সচেতন হবে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তথ্য চেপে রাখার প্রবণতা আছে। এসব দেশের অনেক কাজেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে ব্যক্তি স্বার্থকেই অনেক সময় প্রাধান্য দিয়ে থাকে এবং তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করা হয়। এতে সাধারণ জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের সেবা সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি হয়না। কারণ তারা সঠিক তথ্য জানতে পারেনা।

তবে জনসংযোগ নিয়ে আমাদের শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও তেমন ভালো ধারণা নেই। তা ছাড়া অনেক পাবলিক প্রতিষ্ঠান তথ্যকে অনেক সময় প্রকাশও করতে চায়না। তবে এটাও ঠিক, এখন অনেক পরিবর্তন আসছে। এখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই জনসংযোগ দপ্তর আছে এবং তারা ভালো কাজ করছে। অনেক সময় দেখা যায়, একজন জনসংযোগ কর্মকর্তা যখন প্রতিষ্ঠানের পজিটিভ দিকগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মসহ অন্যান্য মাধ্যমে তুলে ধরেন, তখন কেউ কেউ আবার এটাকে তোষামোদ আকারে দেখতে চান। আসলে আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় দেখা যায়, তোষামোদকেই একটা যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়।

এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোও ভালোভাবে পরিচালিত হতে পারেনি, এবং যোগ্য মানুষগুলো নিজের কাজ ও প্রতিভা বিকাশে ব্যর্থ হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সাথে সাধারণ জনগণও বঞ্চিত হয়েছে। সেদিক থেকে অনেকেই জনসংযোগ সম্পর্কে কোনো ধারণা না রেখেই, তোষামোদের সাথে মিলাতে চান। কিন্তু জনসংযোগের কাজের ধরনটাই হলো প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক দিকগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা। আসলে জনসংযোগ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের ভিতরের লোকজনের মধ্যে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই। অনেকে ভাবে, একজন সাংবাদিক যেমন বিভিন্ন বিষয়ের নেতিবাচক খবরগুলো মিডিয়াতে তুলে ধরে, সে হিসেবে জনসংযোগ কর্মকর্তাও নেতিবাচক কোনো বিষয় তুলে ধরবে। কিন্তু জনসংযোগের সাথে নেতিবাচক শব্দগুলো কখনোই যাবেনা। বরঞ্চ তিনি নেতিবাচক চিন্তার একদম বিপরীত মেরুতে কাজ করবেন।

বিখ্যাত ব্যক্তিদেরও জনসংযোগ কর্মকর্তা থাকে। জনসংযোগ কর্মকর্তা সেই ব্যক্তিকে সমাজে আরও ইতিবাচকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেন এবং তাঁর ভালো কাজগুলোকে মিডিয়ায় প্রকাশ করেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জনসংযোগের কার্যক্রম মূলত উপাচার্যকে কেন্দ্র করেই হয়ে থাকে, কারণ তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁকে আবর্তিত করেই কাজগুলো সম্পন্ন হয়ে থাকে এবং একজন উপাচার্য মিডিয়ার কেন্দ্রে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। গণমাধ্যমও তাঁকেই ফোকাস করবে তাদের পলিসি অনুযায়ী। সেদিক থেকে একজন জনসংযোগ কর্মকর্তাকেও সেভাবে কনটেন্ট দিতে হয় মিডিয়াকে। তা ছাড়া কোনো প্রোগ্রামে উপাচার্য উপস্থিত না থাকলে, স্বভাবতই সেই প্রোগ্রামের গুরুত্ব কমে যাবে মিডিয়ার কাছে।

লেখক : মো. বাবুল হোসেন
উপপরিচালক (জনসংযোগ)
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।