প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও মানসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ক্যাম্পাসজুড়ে শৌচাগারের সংকট, অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিনের অভিযোগ থাকলেও বিষয়টিকে ‘ছোট সমস্যা’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের শৌচাগারগুলোর অবস্থা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। অধিকাংশ শৌচাগার অন্ধকার, দুর্গন্ধযুক্ত এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। কোথাও দরজার খিল নেই, কোথাও দরজাই ভাঙা। অনেক শৌচাগারে সাবান, টিস্যু কিংবা টিস্যু ফেলার ঝুড়ির ব্যবস্থা নেই। পানির বদনাও নেই বেশ কয়েকটি ওয়াশরুমে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক ভবনে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোনো শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। ফলে ছেলে-মেয়ে একই ওয়াশরুম ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এতে নারীদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নারী শিক্ষার্থীরা জানান, মাসিককালীন সময়সহ শারীরিক নানা জটিলতায় জরুরি ভিত্তিতে ওয়াশরুম ব্যবহারের প্রয়োজন হলেও তা সম্ভব হয় না। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যা অনেক সময় শারীরিক ও মানসিক কষ্ট বাড়িয়ে দেয়।
আরও সংকট তৈরি হয় বিকেল ৪টার পর। এ সময় অধিকাংশ একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে পড়তে আসা বা বিকেলে ক্যাম্পাসে অবস্থান করা নারী শিক্ষার্থীরা তখন চরম বিপাকে পড়েন। অবকাশ ভবনের নিচে থাকা শৌচাগারটি ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের মসজিদের ওয়াশরুম ব্যবহারের চেষ্টা করেন। তবে সেখানে প্রবেশেও রয়েছে নানা বিধিনিষেধ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৮তম আবর্তনের এক নারী শিক্ষার্থী বলেন,
“আমরা তিন বান্ধবী সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে একটু আড্ডা দিতে আসি। ওয়াশরুমের প্রয়োজন হলে অবকাশ ভবনের নিচের ওয়াশরুমে যেতে হয়। কিন্তু সেগুলো এতটাই অপরিচ্ছন্ন এবং দরজাগুলো ভাঙা যে একজন নারীর জন্য এমন পরিবেশ মোটেও নিরাপদ না।”
আরেক নারী শিক্ষার্থী বলেন,
“এখানে মেয়েদের জন্য ভালো কোনো ওয়াশরুম নেই। অফিসিয়ালি ক্যাম্পাস ৪টায় বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু লাইব্রেরিতে পড়তে আসা মেয়েরা তখন বিপাকে পড়ে। অবকাশ ভবনের নিচের ওয়াশরুমে যাওয়ার মতো অবস্থাই নেই।”
শুধু নারী শিক্ষার্থীদের নয়, সামগ্রিকভাবে জবির শৌচাগারগুলোর অবস্থা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ক্যান্টিনের পেছনের শৌচাগারগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় শ্যাওলা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। একাডেমিক ভবনগুলো বিকেল সাড়ে ৩টার পর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাইব্রেরি ও ক্যাম্পাসে অবস্থানকারী শিক্ষার্থী এবং দর্শনার্থীরা বাধ্য হয়ে এসব শৌচাগার ব্যবহার করেন।
কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়াম সংলগ্ন শৌচাগারটিও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সেখানে কোনো স্যানিটাইজেশন ব্যবস্থা নেই, নেই টিস্যু কিংবা টিস্যু ফেলার ঝুড়ি। ফলে বেসিনগুলো পানি ভর্তি ও নোংরা অবস্থায় পড়ে থাকে।
রফিক ভবনের চিত্র আরও হতাশাজনক। চারুকলা, বাংলা ও ইতিহাস বিভাগের প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নিচতলায় চারটি এবং চতুর্থ তলায় দুটি শৌচাগার থাকলেও মেয়েদের জন্য কার্যকর ওয়াশরুম রয়েছে মাত্র একটি। অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আলাদা ও তালাবদ্ধ বাথরুমের ব্যবস্থা থাকায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শিহাব বলেন,
“এখানে তো আসাই যায় না। বাথরুমগুলো এত নোংরা। দরজার ছিটকানি নেই, প্রয়োজনীয় কিছুই নেই। সবসময় ময়লা থাকে। এসব দেখার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের।”
নারী শিক্ষার্থী সুমি ও শিমলা জাহান বলেন,
“আমাদের এখানে মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেশি, কিন্তু বাথরুম নেই পর্যাপ্ত। নিচতলায় একটা মাত্র ওয়াশরুম দিয়ে কীভাবে সবাই চলবে? এত নোংরা থাকে যে অনেক সময় ব্যবহারই করা যায় না। স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্থা তো কল্পনাও করা যায় না।”
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেকার ওমর শেখ বলেন,
“আমরা বেসিন ও ওয়াশরুমের মারাত্মক সংকটে ভুগছি। অনেক বেসিন অকেজো অবস্থায় শো-পিসের মতো পড়ে আছে। এগুলোর দ্রুত সংস্কার দরকার।”
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ধ্রুব বলেন,
“দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও ওয়াশরুমের মতো সেনসিটিভ বিষয়ে সবাই দেখেও না দেখার ভান করে। দ্রুত এর একটা স্থায়ী বন্দোবস্ত দরকার।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী কাওসার বলেন,
“আমাদের ফ্লোরে তিনটি বিভাগের জন্য মাত্র একটি ওয়াশরুম বরাদ্দ। তিনটি বেসিনের মধ্যে একটি অকার্যকর। ওয়াশরুমগুলোর নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ আমাদের প্রতিদিন ভোগাচ্ছে।”
ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মাইন বলেন,
“আমাদের তিনটি ওয়াশরুমের মধ্যে একটি পরিত্যক্ত, বাকি দুইটির অবস্থাও খুব খারাপ। পুরো পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। প্রশাসনের উচিত নিয়মিত এসব বিষয় তদারকি করা।”
তবে শিক্ষার্থীদের মতে, শুধু আশ্বাস নয়—নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা, নিরাপদ ও মানসম্মত শৌচাগার নিশ্চিত করা এখন জরুরি। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই অব্যবস্থাপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য দুটোকেই চরম ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা তাদের।
কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও সংস্কার উদ্যোগ
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি নিরসনে এবং সংকট সমাধানে কাজ করছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)।
জকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ বলেন, “নির্মাণাধীন ওয়াশরুমের দরজা প্রোক্টর অফিসের গেটের মুখোমুখি হওয়ায় নারীদের অস্বস্তি হতে পারে। তাই প্রোক্টর অফিসের গেটটি বাম পাশ থেকে ডান পাশে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।”
বিকেলের ভোগান্তি নিরসনে পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা সংস্কারের মাধ্যমে রফিক ভবনের নিচতলার ওয়াশরুমটির প্রবেশপথ বাইরের দিকে (ফুড কোর্টের সামনে) করার পরিকল্পনা করছি, যাতে অফিস আওয়ারের পরেও শিক্ষার্থীরা এটি ব্যবহার করতে পারেন। কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে জকসুর পক্ষ থেকে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক কে. এ. এম. রিফাত হাসান বলেন, “শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি আসলেই দুঃখজনক। আমরা ইতোমধ্যেই ক্যাফেটেরিয়ার পাশে নতুন শৌচাগার নির্মাণাধীন রয়েছে। ভবিষ্যতে আরো কাজ হবে এবং পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিতেও আরো গুরুত্বারোপ করা হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যেহেতু রফিক ভবনে মেডিকেল সেন্টার আছে, তাই সেখানকার পাশাপশি বিবিএ ভবনের নিচতলার শৌচাগার খোলা রাখা যায় কিনা তা আমরা দেখব। তবে রাতের বেলার নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করেই সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:২৪ অপরাহ্ণ