আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে। ইশতেহারে শিক্ষাখাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নৈতিকতা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ, বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ও সরকারি হোম ইকোনমিকস কলেজ একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।
ইশতেহারে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক ভিশন হিসেবে ‘নৈতিক ও উন্নত জাতি গঠনে সমন্বিত ও সামগ্রিক শিক্ষা’ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে শিক্ষা সংস্কার ও বাস্তবায়ন তদারকিতে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের পাঠ্যক্রম টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), শ্রমবাজারের চাহিদা এবং ধর্মীয় নীতিমালা ও নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির পর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামিক শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা—এই চারটি পৃথক ধারায় বিভক্ত করার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে।
উচ্চশিক্ষা খাতে অনিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রোধ ও মান পুনর্মূল্যায়নের লক্ষ্যে একটি পৃথক উচ্চশিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও ভিজিটিং প্রফেসর এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালুর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিশ্চিত করতে ডে-কেয়ার সেবা, স্বাস্থ্যগত কারণে পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং ডিজিটাল প্রশাসনিক সেবা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নাগরিক ও নেতৃত্ব দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাঠ্যসূচিতে নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা এবং কমিউনিটি সেবা কার্যক্রম চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় ছাত্ররাজনীতির পরিবর্তে ছাত্র-সংসদভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি চালু এবং নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে ছাত্র-সংসদ নির্বাচন আয়োজন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে ওইসিডির পিসা কর্মসূচির পাইলট সংস্করণ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া রোধে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আওতায় আনা এবং পথশিশুদের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধে নিয়মিত নিরপেক্ষ অডিট, প্রশাসনিক নজরদারি, ভর্তি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ই-মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনকে বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
শিক্ষকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণলব্ধ দক্ষতার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সব স্তরের ভর্তি পরীক্ষায় আবেদন ফি প্রত্যাহারের ঘোষণাও রয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে স্বকীয়তা বজায় রেখে আধুনিকায়ন, ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো সরকারি করা, প্রতি জেলায় একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণ এবং কওমি শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আরব বিশ্বসহ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় ‘শিক্ষার্থী স্বাস্থ্য ফান্ড’ ও বিমা ব্যবস্থা চালু, বিনামূল্যে বিদেশি ভাষা শিক্ষা, চাকরিপ্রস্তুতি প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা এবং উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী ও চাকরিমুখী করার বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন, পর্যায়ক্রমে শিক্ষা বাজেটে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসিক সহায়তা প্রদান, মেধাবী শিক্ষার্থীদের কর্জে হাসানা এবং নারীদের স্নাতক পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ