এক সময় ইন্টারনেট ছিল বিলাসবহুল। এখন ইন্টারনেট যেন আলো-বাতাস,- চাই বা না চাই, শ্বাস নিতে হচ্ছে কিংবা দেখতে হচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর, চা-স্টল থেকে শোবার ঘর- সবখানেই “নেট আছে?” “ডাটা আছে?” প্রশ্নটি এখন মৌলিক চাহিদার পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল লিটারেসি ছাড়া এই সহজলভ্য ও যথেচ্ছা ইন্টারনেট ব্যবহার কি আদৌ আমাদের দরকার ছিল? নাকি আমরা এমন এক অস্ত্র নিজের হাতে তুলে দিয়েছি, যার ট্রিগার চালাতে জানি না, কিন্তু গুলি ছুটছে অবিরাম?

বাংলাদেশে ইন্টারনেট এখন তুলনামূলকভাবে সস্তা। মোবাইল ডেটা প্যাকেজের দাম দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে কম, এমনকি কিছু উন্নত দেশের তুলনায়ও। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউরোপের অনেক দেশে যেখানে মাসিক ইন্টারনেট বিল গড়ে ৪০-৬০ ইউরো, সেখানে বাংলাদেশে ৫০০-৭০০ টাকায় “আনলিমিটেড” স্বপ্ন বিক্রি হয়। কিন্তু পার্থক্যটা দামে নয়, ব্যবহারে।

উন্নত দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে একটি মৌলিক শর্ত জড়িত,-ডিজিটাল সচেতনতা। স্কুল থেকেই শেখানো হয় অনলাইন আচরণ, তথ্য যাচাই, প্রাইভেসি, সাইবার সিকিউরিটি। সেখানে ইন্টারনেট মানে শুধু স্ক্রল করা নয়, ফেইসবুক কিংবা টিকটক নয়; ইন্টারনেট মানে কাজ, গবেষণা, উৎপাদনশীলতা। আর আমাদের এখানে? ইন্টারনেট মানে-গুজব, গালাগালি, ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা, আর মাঝেমধ্যে “স্ক্রিনশট নিলাম, ভাইরাল করলাম।”

দেশে ডিজিটাল লিটারেসি এখনও শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গ্রামের একজন কিশোর, যে জীবনে কখনো মিডিয়া এথিক্স শব্দটা শোনেনি, তার হাতে যখন স্মার্টফোন আর সস্তা ডেটা তুলে দেওয়া হয়, তখন সে ইউটিউব দেখে শেখে-কীভাবে অপমান করতে হয়, ফেসবুক দেখে শেখে-কীভাবে মিথ্যা ছড়াতে হয়, আর টিকটক দেখে শেখে-কীভাবে রাতারাতি বিখ্যাত হওয়া যায়। এই শেখাটার নাম কি শিক্ষা, না কন্ডিশনিং?

মজার বিষয় হলো, আমরা ইন্টারনেটকে উন্নয়নের সূচক হিসেবে দেখাতে ভালোবাসি। “এত কোটি ইন্টারনেট ইউজার”-এই সংখ্যাটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু কেউ হিসাব করে দেখে না, এই ব্যবহারকারীদের কতজন জানে অনলাইন তথ্য যাচাই কীভাবে করতে হয়? কতজন জানে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট মানে কী? কতজন বোঝে একটি পোস্টের আইনি ও সামাজিক পরিণতি কী হতে পারে?

উন্নত দেশে ইন্টারনেট দামি, কিন্তু দায়িত্বশীল। আমাদের এখানে ইন্টারনেট সস্তা, কিন্তু বেপরোয়া। সেখানে একজন নাগরিক পোস্ট করার আগে ভাবে-“এটা কি সত্য?” আর এখানে একজন ভাবে-“এটা ভাইরাল হবে তো?” পার্থক্যটা এখানেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- ইন্টারনেটের যথেচ্ছা ব্যবহার আমাদের মনোজগতকে কীভাবে প্রভাবিত করছে। পড়ার অভ্যাস কমছে, মনোযোগের স্থায়িত্ব কমছে, সহনশীলতা কমছে। পাঁচ মিনিটের ভিডিও না হলে আমরা আগ্রহ হারাই। অথচ উন্নত দেশে একই ইন্টারনেট ব্যবহার করে মানুষ অনলাইন কোর্স করে, নতুন স্কিল শেখে, রিমোট কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা আনে। আমরা সেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে কী করছি? কমেন্টে ঝগড়া, হিংসা-হানাহানি কিংবা মানহানি।

তাই, প্রশ্ন আসতে পারে- তাহলে কি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া উচিত? মোটেই না। সমস্যা ইন্টারনেটে নয়, সমস্যা প্রস্তুতি ছাড়া ইন্টারনেট ছেড়ে দেওয়ায়। ঠিক যেমন লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো বিপজ্জনক, তেমনি ডিজিটাল লিটারেসি ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার সামাজিকভাবে বিপজ্জনক।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই ডিজিটাল বাংলাদেশ চায়, তাহলে আগে দরকার ডিজিটাল নাগরিক। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল এথিক্স, ফ্যাক্ট-চেকিং, সাইবার নিরাপত্তা বাধ্যতামূলক করতে হবে। গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। আর আমাদের প্রত্যেককে বুঝতে হবে-ইন্টারনেট অধিকার, কিন্তু অজ্ঞতা কোনো অধিকার নয়।

সবশেষে প্রশ্নটা আবার তুলি-ডিজিটাল লিটারেসি বিহীন সহজলভ্য ইন্টারনেট কি দরকার? উত্তরটা হয়তো এরকম- ইন্টারনেট দরকার, কিন্তু চোখ বেঁধে নয়। নইলে এই “সস্তা নেট” একদিন আমাদের সবচেয়ে দামী ভুল হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : ড. ইকবাল আহমেদ
কলামিস্ট ও অধ্যাপক,
কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।