খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ১৩ মার্চ একটি চিরস্মরণীয় ও বেদনাবিধুর দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে সুন্দরবনের কটকা এলাকায় শিক্ষা সফরে গিয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর মোট ১১ জন শিক্ষার্থী সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়ে প্রাণ হারান। স্বপ্নময় তরুণ প্রাণের এই করুণ পরিণতি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
দুর্ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের ৯ জন শিক্ষার্থী শাহাদতবরণ করেন। তারা হলেন— আরনাজ রিফাত রূপা, মোঃ মাহমুদুর রহমান, মাকসুমুল আজিজ মোস্তাজী, আব্দুল্লাহ হেল বাকী, কাজী মুয়ীদ বিন ওয়ালী, মোঃ কাওসার আহমেদ খান, মুনাদিল রায়হান বিন মাহবুব, মোঃ আশরাফুজ্জামান এবং মোঃ তৌহিদুল এনাম। পাশাপাশি বুয়েটের দুই শিক্ষার্থী সামিউল ও শাকিলও প্রাণ হারান।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে প্রতিবছর ১৩ মার্চ দিনটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শোক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিনটিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শহীদ শিক্ষার্থীদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করেন। এর মধ্যে রয়েছে শ্রদ্ধা নিবেদন,দোয়া মাহফিল,জুম্মা বাদ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এবং এতিমদের সাথে ইফতার ও নৈশভোজ বাদ মাগরিব, এতিমখানা খুলনা।
স্থাপত্য ডিসিপ্লিন ২৩ ব্যাচের মৌমিতা বলেন, “১৩ই মার্চ। আমি তাদের দেখিনি, তাদের হাসির শব্দও শুনিনি—তবুও ‘কটকা’ শব্দটা শুনলেই বুকটা কেমন জানি ভারী হয়ে আসে।
স্থাপত্যের সেই এগারোটি নক্ষত্রকে সমুদ্র কেড়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এ ক্যাম্পাসের প্রতিটি ধূলিকণায় আজও তাদের অস্তিত্ব মিশে আছে। আমরা যারা পরে এসেছি, আমাদের কাছে কটকা মানে এক নীরব উত্তরাধিকার; যেখানে শোক আর স্থাপত্য মিলেমিশে একাকার। তারা নেই, কিন্তু এই ক্যাম্পাসের দীর্ঘশ্বাসে তারা বেঁচে থাকবে চিরকাল।”
স্থাপত্য ডিসিপ্লিন ২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী তাসনীম বলেন, এগারোটি তরুণ স্বপ্ন সমুদ্র কেড়ে নিয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু তাদের পথচলার স্মৃতি এই ক্যাম্পাসে এখনো নীরবে রয়ে গেছে। আমরা যারা পরে এসেছি, আমাদের কাছে কটকা শুধু একটি স্থান নয়—এটা এক নীরব স্মরণ, এক অদৃশ্য বন্ধন, যেখানে শোক আর স্থাপত্য একই গল্পে মিশে আছে।
স্থাপত্য ডিসিপ্লিন ২৩ ব্যাচের নওমী বলেন, প্রথম বর্ষে যখন আমরা নতুন নতুন আর্কিটেকচারের জগতে পা রেখেছিলাম, তখনই প্রথম কটকা ট্রাজেডির গল্পটি শুনেছিলাম। সেদিন সেই গল্প শুনে আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে যেন এক শীতল শিহরণ বয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল—যারা হারিয়ে গিয়েছিলেন, তারা তো আমাদেরই মতো; তারাও হয়তো প্রথম বর্ষে একই রকম স্বপ্ন, একই রকম উত্তেজনা নিয়ে এই পথচলা শুরু করেছিলেন।
তারপর ধীরে ধীরে দুই বছর কেটে গেল। স্টুডিও, জুরি, রাত জেগে করা ড্রয়িং, বন্ধুদের সাথে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত—সবকিছুর মাঝেই প্রতি বছর কটকা দিবস ফিরে এসেছে। প্রতিবারই মনে হয়েছে, আমরা যেন আরেকটি বছর পার হয়ে গেলাম, আর সেই স্মৃতি আরও একটু গভীর হয়ে আমাদের ভেতরে বসে গেল।
আজ তৃতীয় বর্ষে দাঁড়িয়ে, যখন আমরা দুইবার কটকা দিবস পার করে এসেছি, তখন অনুভূতিটা আরও ভারী লাগে। মনে হয়—যাদের আমরা হারিয়েছি, তারাও তো একসময় আমাদের মতোই এই পথ দিয়ে হেঁটেছিলেন, একই স্বপ্ন বুকে নিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. রেজাউল করিম বলেন, মানুষের স্মৃতি সবসময় বিরাজমান। এর মাধ্যমে পুরনো কথা জাগ্রত হয়। আজকের এদিনে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে যেভাবে অ্যালামনাইরা দাঁড়িয়েছেন, তা একটি মহৎ কাজ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় যতদিন থাকবে, কটকার শোকাবহ পরিবেশ ততদিন থাকবে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কখনও যেন কটকার মতো দুর্ঘটনা না ঘটে এ জন্য সেশনাল ট্যুরে সর্বোচ্চ সতর্কতা অনুসরণ করতে হবে।
শহীদ শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ ও স্মৃতি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কাছে চিরস্মরণীয়। ১৩ মার্চ শুধু একটি তারিখ নয়; এটি হারানো স্বপ্ন, অসমাপ্ত সম্ভাবনা এবং প্রেরণার প্রতীক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতিই আমরা কৃতজ্ঞ থাকি।
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ২:৩১ অপরাহ্ণ