ঈদুল ফিতর মুসলিম জাতির বড় ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে একটি। ঈদ নিয়ে প্রত্যেকের থাকে নিজস্ব চিন্তাভাবনা। প্রত্যেকের এসব আলাদা ভাবনা সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের ঈদুল ফিতর নিয়ে ভাবনা ও অনুভূতি তুলে ধরেছেন চবি শিক্ষার্থী নুসরাত সুলতানা।
ঈদ হোক সম্পর্কের বাঁধন দৃঢ় করার মহোৎসব
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যান্ত্রিক ব্যস্ততায় আগের সেই শৈশবের ঈদের আমেজ যেন কিছুটা ম্লান হয়েছে। মনে পড়ে খেলারসাথীরা ঈদের আগে না দেখে মতো নতুন জামা লুকিয়ে রাখা, বাবার থেকে সালামি নিয়ে ঈদগাহে যাওয়া, আম্মুর কাছে টাকা জমানো কিংবা নতুন সুন্দর কম টাকার নোটের বিনিময়ে বোকার মতো বেশি টাকার নোট দিয়ে দেওয়া সেই নষ্টালজিয়া। ঈদের পর পরীক্ষা থাকায় এবারের সময়ও কাটছে একাডেমিক ব্যস্ততায়। যান্ত্রিক জীবনের শত ব্যস্ততা সরিয়ে শিকড়ের টানে পরিবার কিংবা আত্মীয় স্বজনের সান্নিধ্যে ফেরাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সবার আগ্রহ থাকে তাদের ছেলে কবে আসবে! এই যে উনাদের ভালোবাসা ও দোয়া এটাই বাড়ি আসার বড় অনুপ্রেরণা। ঈদ কেবল উৎসব নয় বরং পরিবার, আত্মীয় স্বজন, পুরোনো বন্ধুদের সাথে সম্পর্কের বাঁধন দৃঢ় করার সুযোগ। ডিজিটাল একাকীত্ব ঘুচিয়ে সরাসরি কুশল বিনিময় করার মাধ্যমেই ঈদ পূর্ণতা পাক।
মাঈন উদ্দীন হাসান রিয়াদ
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ধনী দরিদ্রের মাঝে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা
‘‘ও মন রমজানের ঔ রোজার শেষে এলো খুশির ইদ’’ গানটি শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ সকালের আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ। রমজানের আধ্যাত্মিক সিয়াম সাধনার পর সকল মুসলিম নর নারী অপেক্ষায় থাকে এই দিনটির জন্য। নতুন জামা, সুগন্ধি, সেমাই, সালামি ঈদের আনন্দকে আরো সমৃদ্ধ করে। শান্তির ধর্ম ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্যের প্রতীক জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পায় সাম্য ও সৌহার্দ্যর অনন্য নিদর্শন এতে ধনীদের সম্পদ পবিত্রতা পায় আর নিশ্চিত হয় গরিবের ইদের আনন্দ। ছিন্নমূল মানুষদের ইদের দিনটাকে আরেকটু উত্তম করার জন্য এগিয়ে আসে কিছু মানবিক লোকজন সাধ্যমত দেয় ঈদ উপহার। আমরা চাই সকল মুসলিম ঈদ সম্পর্কিত ধর্মীয় বিধান মেনে সকলে একসাথে ঈদ উদযাপন করবে। সব মিলিয়ে মুসলমানদের এ দিনটির মাহাত্ম্য অনন্য৷
ছিদরাতুল মুনতাহা, শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদুল ফিতর : সংযমের শেষে আনন্দের উচ্ছ্বাস
রমজানের দীর্ঘ এক মাস সংযম, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধির সাধনার পর মুসলিম বিশ্বে আসে আনন্দের বার্তা—ঈদুল ফিতর। ঈদের সকাল শুরু হয় এক ভিন্ন আবহে। নতুন পোশাক পরে মানুষ ছুটে যায় ঈদগাহ বা মসজিদের দিকে। নামাজ শেষে কোলাকুলি আর “ঈদ মোবারক” শুভেচ্ছায় ভরে ওঠে চারপাশ। ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই যেন এক আনন্দের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়।
ঈদের দিনে ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানা রকম সুস্বাদু খাবার। বিশেষ করে সেমাই যেন ঈদের আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, ছোটদের নতুন পোশাক ও উপহার দেওয়া সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দময়।
তবে ঈদুল ফিতরের প্রকৃত শিক্ষা নিহিত আছে সংযম, ক্ষমা ও ভালোবাসার মধ্যে। এক মাসের রোজা মানুষকে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়, আর ঈদ সেই শিক্ষাকে আনন্দের মাধ্যমে উদযাপন করে। তাই শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি মানুষের মাঝে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার বন্ধন আরও দৃঢ় করে তোলার এক মহৎ উপলক্ষ।
অতসী অরণ্য, শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদ হোক সার্বজনীন
পবিত্র ঈদুল ফিতর শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আমাদের শেখায় ধৈর্য, সংযম এবং সহমর্মিতা। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর ঈদ আসে আনন্দ, নতুন উদ্দীপনা এবং আত্মশুদ্ধির বার্তা নিয়ে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি অনুভব করি, ঈদ কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগাভাগি করা প্রয়োজন।
অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করা, এটাই ঈদের প্রকৃত শিক্ষা। ধনী-গরিব, ছোট-বড় সকল ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। ঈদ আমাদের শেখায় ভালোবাসা, মানবতা ও সম্প্রীতি। তাই আমি চাই, ঈদ হোক সার্বজনীন- আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি প্রাণে, প্রতিটি হৃদয়ে, এবং এই পবিত্র উৎসব বয়ে আনুক শান্তি, সৌহার্দ্য ও সমাজে একতা ও কল্যাণের বার্তা।
সোয়াইব ইসলাম শুভ
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে
মুসলমানদের জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ঈদ, যা ইসলামী সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। আমরা জানি, ‘‘ঈদ’’ অর্থ ফিরে আসা। সত্যিই তাই, ঈদ বারবার ফিরে আসে আনন্দ, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে। এ মহান উৎসব মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবতাবোধ। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা থাকবে, ঈদ আনন্দ ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে, ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের প্রতিটি মানুষের মাঝে। সামর্থবানরা যেন ঈদগাহ যাওয়ার পূর্বে তাদের যাকাত হক্বদারদের মাঝে পৌঁছে দেন। ধনী-গরীব, বন্ধু-শত্রু সব ভেদাভেদ ভুলে, সবাই এক হয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরি। যেমনভাবে কাজী নজরুল ইসলাম বলেন ‘‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন, হাত মেলাও হাতে। তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।’’ আসুন! ঈদের দিনে তাকবীর ধ্বনি তুলে ঈদগাহ যাই আর পরস্পরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলি তাক্বব্বালাল্লাহ মিন্না ওয়া মিনকুম।
এম জহুর আল-খাত্তাব
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬, ৭:২৩ অপরাহ্ণ