বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই গণতন্ত্র, যুক্তি এবং রাষ্ট্রচিন্তার এক পরিশীলিত ধারার কথা মনে পড়ে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সেই বিরল প্রজন্মের একজন, যিনি কেবল রাজনীতির মঞ্চেই নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরেও নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিল এক ধরনের গণতান্ত্রিক চেতনা—যা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল।
খুব ছোটবেলায় বাবার মুখে মওদুদ আহমদের নাম শুনেছি। একটু বড় হওয়ার পর যখন রাজনৈতিক নানা বিষয় জানতে শুরু করি তখন থেকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ছিল আমার কল্পনার জগতের অন্যতম নায়ক। এমনকি তাঁকে দেখেই একসময় আইন বিষয়ে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল আমার।
রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও লেখক—তিন পরিচয়েই সমুজ্জ্বল ছিলেন তিনি।
আজীবন দেশ ও মানুষের সেবা করে গেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্র। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকেও সত্য উচ্চারণ ও নিজের বিশ্বাসের কথা বলেছেন অকপটে। তাঁর লেখনী শক্তিও ছিল অসাধারণ।
তাঁর লেখায় ও বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে সংবিধানের গুরুত্ব, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রয়োজনীয়তা। তিনি এমন এক রাজনীতির কথা বলেছেন, যেখানে মতের ভিন্নতা বিভাজন তৈরি করে না, বরং সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করে। আজকের বাস্তবতায় এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রায়শই সংঘাতমুখী হয়ে ওঠে।
মওদুদ আহমদের রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছেন, আবার সময়ের প্রয়োজনে বিরোধী কণ্ঠস্বর হিসেবেও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এই উত্থান-পতনের মধ্যেও যে বিষয়টি অটুট ছিল, সেটি হলো তাঁর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং জনগণের মত প্রকাশের অধিকারে নিহিত।
ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে মওদুদ আহমদ যে সফলতা পেয়েছেন তা এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।
তিনি বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রীও। বারবার সংসদ সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন এই অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এবং বিদেশি আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ছিলেন তিনি।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবীদের একজন ও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের ডাকা গোলটেবিল বৈঠকে আইনজীবী এবং অরাজনৈতিক, অবৈতনিক সচিব হিসেবে শেখ মুজিবের সাথে ছিলেন।
লেখক হিসেবেও মওদুদ আহমদ ছিলেন অনন্য। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট’, ‘এ স্টাডি অব পলিটিক্স অ্যান্ড মিলিটারি ইন্টারভেনশন ইন বাংলাদেশ’, ‘এরা অফ শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ কনস্টিটিউশনাল কোয়েস্ট ফর অটোনমি’, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র ১৯৯১ থেকে ২০০৬, ‘কারাগারে যেমন ছিলাম ২০০৭-২০০৮’, ‘বাংলাদেশ : শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’।
বর্তমান প্রজন্মের জন্য মওদুদ আহমদ একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ রেখে গেছেন—রাজনীতি মানেই প্রতিপক্ষকে দমন করা নয়; বরং মতের ভিন্নতাকে সম্মান জানিয়ে একটি সহাবস্থানের পথ তৈরি করা। এই শিক্ষা আজকের বিভাজিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ধরনের আলোকবর্তিকা হিসেবেও কাজ করতে পারে।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ যে বিরল, সাফল্যমণ্ডিত জীবন ও গণতান্ত্রিক চেতনার শিখা রেখে গেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে যাবে। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শই উন্মোচন করবে নতুন দিগন্ত। সবশেষে শুধু এটুকুই বলি—‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, খবরবেলা;
সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (চবিসাস)
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২:১৮ অপরাহ্ণ