মানুষ যখন স্থায়ী কৃষির ধারণা জানত না, তখন প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক অনন্য পদ্ধতি হিসেবে জন্ম নিয়েছিল জুমচাষ। পাহাড়, বন আর আদিবাসী জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই কৃষিপদ্ধতি শুধু খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, জীবনদর্শন এবং পরিবেশভিত্তিক জ্ঞানচর্চার অংশ। আধুনিক যান্ত্রিক কৃষির যুগে জুমচাষকে অনেকে প্রাচীন বা অনুৎপাদনশীল মনে করলেও বাস্তবে এটি বহু অঞ্চলের মানুষের অভিযোজনমূলক কৃষি ব্যবস্থা, যা প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল থেকে শুরু করে ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু স্থানে জুমচাষ আজও প্রচলিত। অঞ্চলভেদে এর নাম, পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য থাকলেও মূল ধারণা এক একটি জমিতে কয়েক বছর চাষ, তারপর জমিকে বিশ্রাম দিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর। জুমচাষ মূলত স্থানান্তর কৃষি (Shifting Cultivation) নামে পরিচিত।
বাংলাদেশে এটি প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান অঞ্চলে এবং গারো পাহাড় এলাকায় প্রচলিত। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা প্রভৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে এটি নিবিড়ভাবে জড়িত। এ অঞ্চলে পাহাড়ের ঢালে বন পরিষ্কার করে ধান, ভুট্টা, হলুদ, আদা, মরিচ, ডাল, শাকসবজি এমনকি তুলাও উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশের জুমচাষে একসঙ্গে মিশ্র ফসল উৎপাদনের প্রবণতা বেশি, যা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করে।
ভারতে জুমচাষ বিশেষভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যে বিস্তৃত অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা। এসব অঞ্চলে জুমচাষ বহু পুরনো কৃষি ঐতিহ্য। স্থানীয়ভাবে এটি ‘জুম’ নামে পরিচিত হলেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। উড়িষ্যায় একে ‘পোডু’, পশ্চিমঘাটে ‘কুমারী’, আর মধ্যপ্রদেশের বস্তার অঞ্চলে ‘পেন্ডা’ বা ‘বেওয়ার’ বলা হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও জুমচাষের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ বহু দেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এখনও এই পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে। ইন্দোনেশিয়ায় এর নাম ‘লাদাং’ (Ladang)।
আমেরিকাতেও স্থানান্তর কৃষির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকায় এটি ‘মিলপা’ (Milpa) নামে পরিচিত। মিলপা পদ্ধতিতে ভুট্টা, শিম ও কুমড়া একসঙ্গে চাষ করা হয়, যা ‘থ্রি সিস্টার্স’ নামে পরিচিত। ব্রাজিলে জুমচাষ ‘রোকা’ (Roca) নামে পরিচিত।
জুমচাষ একটি পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। প্রথমে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে পাহাড়ের ঢালে ঘন জঙ্গল নির্বাচন করে গাছপালা, বাঁশ ও ঝাড় কেটে ফেলা হয়। এরপর মার্চ-এপ্রিল মাসে এসব শুকিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়, যাকে ‘জুম পোড়া’ বলা হয়। এই পোড়ানো থেকে সৃষ্ট ছাই প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। পরে প্রথম বৃষ্টির পর ধান, ভুট্টা, হলুদ, আদা, শাকসবজি ইত্যাদির বীজ একসঙ্গে বপন করা হয়।
জুমচাষ শুধু কৃষিকাজ নয়; এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, উৎসব ও আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গেও জড়িত। তাদের সংগীত, নৃত্য, লোককথা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে জুমচাষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, বন ও পানির উৎস সংরক্ষণ, এবং ভূমির মাইক্রো-ইকো-সিস্টেম রক্ষায় এই প্রথা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই সঙ্গে জুমচাষ বন ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। আবর্তনমূলক চাষের ফলে জমি পুনরুজ্জীবিত হয়, বনভূমি নতুন করে গড়ে ওঠে এবং পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও উদ্ভিদের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। অধিকাংশ জুমনির্ভর জনগোষ্ঠী বন সংরক্ষণ এবং জুমচাষ পাশাপাশি পরিচালনা করে।
জুমচাষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মিশ্র ফসল চাষ। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন হওয়ায় কৃষক খাদ্যের বৈচিত্র্য পায় এবং ঝুঁকি কমে। রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের ব্যবহার কম হওয়ায় এটি তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব। বর্তমানে ‘উন্নত জুমচাষ’ বা Improved Jhum Cultivation ধারণা নিয়ে কাজ হচ্ছে, যেখানে কৃষিবনায়ন (Agroforestry) পদ্ধতির মাধ্যমে জুমচাষকে আরও টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জুমচাষ কেবল একটি কৃষিপদ্ধতি নয়; এটি পাহাড়ি মানুষের প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারার ঐতিহাসিক দলিল। বিশ্বের নানা দেশে ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও এর মূল দর্শন একই প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান।
ম্যাকলিন চাকমা, তরুণ কবি ও লেখক ; রাঙ্গামাটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম।
প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৪৪ অপরাহ্ণ