চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাবেক শিক্ষার্থী বিপুল কুমার যখন প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন তাঁর মাথায় ছিল একটাই প্রশ্ন—যে প্লাস্টিক আজ নদী-সমুদ্র দূষণের বড় কারণ, সেটিই কি সমাধানের অংশ হতে পারে? সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় প্লাস্টিক বর্জ্য-নির্ভর ইন্টারলকিং ব্লক প্রযুক্তি।
বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে বেড়েছে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা। কিন্তু প্রচলিত ইটভাটানির্ভর নির্মাণব্যবস্থা পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর দেশে হাজারো ইটভাটা থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে উর্বর টপসয়েল, বাড়ছে বায়ুদূষণ। একই সময়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় নদী ও উপকূলীয় পরিবেশ পড়ছে মারাত্মক ঝুঁকিতে।
এই দুই সমস্যার সমন্বিত সমাধান হিসেবে বিপুল কুমারের উদ্ভাবন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে।
যেভাবে তৈরি হচ্ছে ব্লক
প্লাস্টিক বর্জ্য—বিশেষ করে শপিং ব্যাগ, মোড়কজাত প্লাস্টিক—সংগ্রহ করে তা পরিষ্কার করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট অনুপাতে বালি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডাস্ট এবং অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে গলিয়ে ছাঁচে ঢেলে তৈরি করা হয় ব্লক। ইন্টারলকিং পদ্ধতিতে তৈরি হওয়ায় একটি ব্লক সহজেই আরেকটির সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
প্রতিটি ব্লকের ওজন প্রায় ২ কেজি, যার অর্ধেকেরও বেশি অংশ প্লাস্টিক বর্জ্য। ফলে একদিকে যেমন বর্জ্য পুনর্ব্যবহার হচ্ছে, অন্যদিকে কম খরচে তৈরি হচ্ছে টেকসই নির্মাণ উপকরণ।
পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতি ব্লকে প্রায় ১–১.৪ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। পাশাপাশি প্লাস্টিক পোড়ানো এড়ানো ও ইটভাটার বিকল্প ব্যবহারের ফলে গড়ে ৩–৫ কেজি কার্বন নিঃসরণ কমানো যেতে পারে।
এতে কমবে নদী ও সমুদ্র দূষণ, হ্রাস পাবে বায়ুদূষণ এবং সংরক্ষিত থাকবে কৃষিজমির মাটি। বন উজাড় ও মিঠা পানির ওপর চাপও কমবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সার্কুলার অর্থনীতিভিত্তিক একটি কার্যকর নির্মাণ সমাধান।
উপকূলে টেকসই আশ্রয়ের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগের পর সাশ্রয়ী ও দ্রুত পুনর্বাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে ইন্টারলকিং ব্লক দিয়ে কম খরচে, দ্রুত এবং পুনঃব্যবহারযোগ্য ঘর তৈরি করা সম্ভব।
এ ধরনের আবাসন নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুর্যোগ-পরবর্তী অনিরাপদ পরিবেশে সহিংসতা ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি কমাতেও এটি সহায়ক হতে পারে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত
এই প্রযুক্তি স্থানীয়ভাবে প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ খুলে দিতে পারে।
এ ছাড়া কার্বন নিঃসরণ কমানোর কারণে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে ‘কার্বন ক্রেডিট’ অর্জনের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে আরও টেকসই করে তুলতে পারে।
প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা
স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মো. মাসুম রেজার মতে, ‘‘এই উদ্ভাবন একাধিক সমস্যার সমাধান দিতে পারে। প্রথমত, এটি নদী ও সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রবাহ কমাবে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত ইটভাটার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে। তৃতীয়ত, মাটি কাটার প্রয়োজন কম হওয়ায় ভূমিক্ষয়ও কমবে।’’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল জানান, ‘‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টেকসই নির্মাণ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে এই ধরনের উদ্ভাবনকে জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য নীতিগত সহায়তা, মান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং বিনিয়োগ অপরিহার্য। সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি রূপান্তরমূলক মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।’’
স্বপ্ন দেখছেন উদ্ভাবক
বিপুল কুমার বলেন, “আমি এমন একটি সমাধান দিতে চাই, যা প্লাস্টিক দূষণ কমাবে এবং একই সঙ্গে উপকূলের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও টেকসই ঘর তৈরি করবে।”
তাঁর এই উদ্ভাবন প্রমাণ করে—সমস্যার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সমাধানের বীজ। প্লাস্টিক বর্জ্য, যা একসময় ছিল পরিবেশের জন্য অভিশাপ, সেটিই এখন হয়ে উঠতে পারে টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।
এই প্রযুক্তির প্রয়োগ পরিবেশগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম। প্লাস্টিক বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত হলে নদী ও সমুদ্রের দূষণ কমবে। ইটভাটার ওপর নির্ভরতা কমায় বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে। কৃষিজমির টপসয়েল সংরক্ষিত থাকবে, বন উজাড়ের চাপ কমবে এবং মিঠা পানির ব্যবহারও হ্রাস পাবে। ফলে এটি একটি কার্যকর সার্কুলার অর্থনীতি-ভিত্তিক নির্মাণ সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তিনি বলেন, উপকূলীয় ও চরাঞ্চলে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ—যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙন—প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে। দুর্যোগ-পরবর্তী আর্থিক সংকটে অনেক পরিবার ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এসব এলাকায় স্কুল ড্রপআউট হার ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে ইন্টারলকিং ব্লক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং স্থানান্তরযোগ্য আবাসন নির্মাণ সম্ভব। লবণাক্ততা সহনশীল এ প্রযুক্তি দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ব্যয় হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই উদ্ভাবনের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য। দুর্যোগ-পরবর্তী আশ্রয় সংকট নারী ও শিশুদের জন্য সহিংসতা, যৌতুকের চাপ, বাল্যবিবাহ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করা গেলে নারীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
পাশাপাশি প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্লক উৎপাদনের মাধ্যমে একটি স্থানীয়ভিত্তিক সার্কুলার অর্থনীতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা উন্নয়ন সম্ভব হবে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নারীদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জোরদার হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এছাড়া, এই উদ্ভাবন জাতিসংঘের একাধিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে এসডিজি লক্ষ্য ১১: সাশ্রয়ী ও টেকসই আবাসন নিশ্চিতকরণ; এসডিজি লক্ষ্য ১২: বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার ও সার্কুলার অর্থনীতি উন্নয়ন; এসডিজি লক্ষ্য ১৩: কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা; এসডিজি লক্ষ্য ১৪: সামুদ্রিক প্লাস্টিক দূষণ কমানো; এসডিজি লক্ষ্য ১৫ : বন উজাড় ও ভূমিক্ষয় হ্রাস।
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ণ