জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এ নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনে অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এ নিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, আন্দোলনের মূল ফোকাস বিচার নিশ্চিত করা হলেও একটি পক্ষ প্রক্টরের পদত্যাগ দাবিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
শনিবার (১৬ মে) রাত দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা টারজান চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী হল প্রদক্ষিণ করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। অভিযুক্তকে গ্রেফতারের জন্য দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পর আন্দোলনকারীরা প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করেন।
এ নিয়ে কিছু শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেছেন, তদন্ত কার্যক্রমে জড়িত পুলিশের ওপর চাপ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হচ্ছে। একইসঙ্গে অভিযুক্তকে গ্রেফতারের দাবির সঙ্গে প্রক্টরের পদত্যাগ দাবিকে অযৌক্তিক বলেও মন্তব্য করেন তারা।
এদিকে ১৬ মে রাতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলন চলাকালে কিছু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী উপাচার্যকে উদ্দেশ করে উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসময় এক বামপন্থী শিক্ষার্থী উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যায়িত করেন।
ক্যাম্পাসের একটি অংশের শিক্ষার্থীদের মতে, বিচার দাবির চেয়ে প্রক্টরের পদত্যাগ ইস্যুকে সামনে আনার পেছনে পূর্বের বিরোধ ও ক্ষোভ কাজ করছে। তাদের দাবি, বর্তমান প্রক্টর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মাদক, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে কয়েকজন বামপন্থী শিক্ষার্থী তদন্তের মুখে পড়েন। সেই ক্ষোভ থেকেই প্রক্টরবিরোধী অবস্থান নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করছেন অনেকে।
বাংলা বিভাগের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং আ ফ ম কামালউদ্দীন হল সংসদের জিএস মুহাম্মদ আবরার শাহরিয়ার বলেন,
“বর্তমান প্রক্টর দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাবির বামপাড়া। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। ধর্ষণচেষ্টার ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা সুযোগ পেয়েছে প্রক্টরকে সরানোর দাবি তোলার। বাস্তবে তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বিচার নয়, প্রক্টরকে অপসারণ করা।”
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ৫৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী
সাদিয়া আফরিন বলেন,
“আমাদের মূল দাবি ছিল ধর্ষণচেষ্টাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“গতরাতে অনুষ্ঠিত একটি মিটিংয়ে রাত ১০টা থেকে সকাল ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত উপস্থিত ছিলাম। সেখানে কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছে। ভিসি, প্রক্টর ও প্রো-ভিসিসহ উপস্থিত শিক্ষকদের প্রতিও কটূক্তি করা হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, তারামন বিবি হল থেকে বের হওয়া মিছিলের মূল ফোকাস হয়ে দাঁড়ায় প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি, যেখানে মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল অপরাধীর বিচার ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আব্দুর রশিদ জিতু বলেন,
“গত ১২ মে রাত ১১টা ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমরা সবসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস হিসেবে দেখেছি। কিন্তু বহিরাগত কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”
তিনি আরও বলেন,
“জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে দুই কর্মদিবসের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। আমাদের দাবি ছিল— অভিযুক্ত দেশের যেখানেই থাকুক, তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে এবং প্রক্টর ও প্রক্টোরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবি করছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক বলেন,“ছাত্রদল সবসময় অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমরা দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।”
তবে আন্দোলনটি পূর্বের ক্ষোভ বা রাজনৈতিক বিরোধের বহিঃপ্রকাশ কিনা— এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রকাশিত: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ৮:২৩ অপরাহ্ণ