লালমনিরহাটে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে কৃষিজমির উর্বরতা। বছরের পর বছর অধিক ফলনের আশায় মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে আগের তুলনায় কমে গেছে উৎপাদন, আর ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। কৃষি ও মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের কৃষি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট জেলার মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৩১ হাজার ১২২ হেক্টর। বর্তমানে জেলার ফসলের নিবিড়তা দাঁড়িয়েছে ২২৯ শতাংশে। এর মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশ জমিতে বছরে দুটি এবং প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে তিনটি ফসল আবাদ করা হচ্ছে।

অল্প সময়ে অধিক ফলন পাওয়ার প্রতিযোগিতায় জেলার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আবাদি জমিতে উচ্চমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে মাটির জৈবগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কমে যাচ্ছে উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা।

সদর উপজেলার মুস্তফি বাজার এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, আগে জমিতে ধান চাষ করলে বিঘাপ্রতি ১৪-১৫ মণ ফলন পাইতাম। এখন ঠিকমতো ১০ মণও পাওয়া যায় না। রাসায়নিক সার বেশি ব্যবহার করার পর থেকে মাটির জোর কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদ করাই কঠিন হয়ে যাবে।

একই উপজেলার আরেক কৃষক আহাদুল ইসলাম জানান, নিয়মিত পটাশ, ফসফেট ও বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করলেও আগের মতো ফলন মিলছে না। গত কয়েক বছরে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাবিব মোহাম্মদ নাসের বলেন, একটি স্বাস্থ্যকর মাটিতে কমপক্ষে ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন। অথচ লালমনিরহাটের অধিকাংশ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ মাত্র ১ থেকে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া জেলার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ জমিতে দস্তার ঘাটতিও রয়েছে। এতে কৃষিজমির প্রাণশক্তি দ্রুত কমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক লাভের আশায় অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার শুধু মাটির ক্ষতিই করছে না, এটি কৃষকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে। পাশাপাশি গৃহপালিত পশু-পাখি ও উপকারী পোকামাকড়ও ক্ষতির মুখে পড়ছে।

মৃত্তিকা গবেষকদের পরামর্শ, মাটির টেকসই উর্বরতা রক্ষায় জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গবাদিপশুর গোবর ও জৈব বর্জ্য ব্যবহার করলে মাটির গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ধৈঞ্চা চাষের মাধ্যমে সবুজ সার উৎপাদন বাড়ালে কৃষিজমির উর্বরতা পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ফল মিলতে পারে।