খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো দিনে যতটা শান্ত ও স্বাভাবিক মনে হয়, সন্ধ্যা নামার পর ততটাই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কোথাও করিডোরজুড়ে আড্ডা, কোথাও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা, আবার কোথাও চায়ের কাপে জমে ওঠে ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা। শিক্ষার্থীদের কাছে হল কেবল থাকার স্থান নয়; এটি তাদের সংগ্রাম, বন্ধুত্ব, স্বপ্ন ও আত্মনির্ভরতার এক অনন্য অধ্যায়।

পরিবার থেকে দূরে থাকা হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে আবাসিক হলই হয়ে ওঠে দ্বিতীয় বাড়ি। কেউ টিউশনি করে নিজের খরচ চালান, কেউ রাত জেগে পড়াশোনা করেন, আবার কেউ পরিবারের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে নিজেকে গড়ে তুলতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যান।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজিতা হলের শিক্ষার্থী নওরিন জাহান অনন্যা বলেন, “হলের প্রাণবন্ত পরিবেশে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। রিডিং রুম ও বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি একাডেমিক চাপ সামলাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি করিডোরের আড্ডা ও ক্যাম্পাসের সবুজ পরিবেশ সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দেয়। এই পরিবেশ আমাকে আত্মনির্ভরশীল হতে শিখিয়েছে।”

একই হলের আরেক শিক্ষার্থী হোসনে আরা বলেন, “শুরুতে পরিবারের বাইরে থেকে সবকিছু নিজে সামলানো কঠিন মনে হয়েছিল। ধীরে ধীরে নিজস্ব রুটিন তৈরি হয়েছে। হল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়া। বন্ধুদের সঙ্গে থাকা এবং নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নতুন এক জীবন গড়ে ওঠে।”

বিজয়-২৪ হলের শিক্ষার্থী আফনান আজিজের মতে, হল জীবন শুধু পড়াশোনা বা ব্যস্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, “এখানে গড়ে ওঠে পরিবারের মতো আন্তরিক সম্পর্ক। একসঙ্গে রান্না করা, আড্ডা দেওয়া কিংবা সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে অসংখ্য স্মৃতি তৈরি হয়। কেউ অসুস্থ হলে রুমমেটরাই সবার আগে পাশে দাঁড়ায়।”

আরেক শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসি বলেন, “তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে হলে থাকার অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজের সব কাজ নিজেকেই করতে হয়। শুরুতে এটি চ্যালেঞ্জিং মনে হলেও পরে অভ্যাসে পরিণত হয়। টিউশনি করা কিংবা নিজে রান্না করার সময় বাবা-মায়ের কষ্ট আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।”

তিনি আরও বলেন, “পরিবারের জন্য মন খারাপ হলেও হল জীবন আমাকে অনেক বাস্তব শিক্ষা দিয়েছে। তাই আমি এই জীবনকে আশীর্বাদ হিসেবেই দেখি।”

শিক্ষার্থীদের মতে, আবাসিক হলের জীবন শুধু একাডেমিক শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি তাদের দায়িত্বশীলতা, আত্মনির্ভরতা, সহমর্মিতা ও বাস্তব জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।