বাংলাদেশে এখন অনেককিছুরই “নিরাপত্তা” আছে! ডিজিটাল নিরাপত্তা, সড়ক নিরাপত্তা, নির্বাচন নিরাপত্তা, ভিআইপি নিরাপত্তা, এমনকি ফেসবুক স্ট্যাটাসেরও নিরাপত্তা আছে। শুধু নিরাপদ নয়-আমাদের খাবার। যে খাবার খেয়ে মানুষ বাঁচবে, সন্তান বড় হবে, জাতি গড়ে উঠবে, সেই খাবার নিয়েই যেন সবচেয়ে কম উদ্বেগ। মনে হয় আমরা এমন এক অদ্ভুত দেশে বাস করি, যেখানে মানুষ খাবার কিনতে কিংবা খেতে হোটেল-রেস্টুরেন্ট কিংবা দোকানে যায়, কিন্তু মনে মনে দোয়া করে—“আল্লাহ, এটা যেন খাবারই হয়!”

দেশে এখন প্রায় সব ফল পাকানো হয় রাসায়নিক দিয়ে, মাছ-মাংস “তাজা” রাখা হয় ফরমালিনে, মুরগি মোটা করা হয় অ্যান্টিবায়োটিকে, সবজি চকচকে করা হয় বিষাক্ত রঙে, আর শিশুর চিপসের প্যাকেটে লুকিয়ে থাকে ক্যানসারের উপাদান। অথচ আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, বাজারে গিয়ে বিষমুক্ত খাবার খোঁজা এখন অনেকটা “খড়ের গাদায় সুই” খোঁজার মতো শোনায়- তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, বাস্তবে বিরল।

বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরীক্ষিত খাদ্য নমুনার প্রায় ৩৩ শতাংশই ছিল ভেজাল, দূষিত বা নিম্নমানের। অর্থাৎ প্রতি তিনটি খাদ্যের একটি নিরাপদ নয়। শিশুদের জনপ্রিয় চিপসের ৬৫ শতাংশ নমুনায় পাওয়া গেছে অ্যাক্রাইলামাইড নামের ক্ষতিকর রাসায়নিক, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। অথচ টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হয়, ওই চিপস খেলেই শিশু পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস পাবে, গিটার বাজাবে আর জাতীয় দলে খেলবে!

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই খাদ্য দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারী ও শিশুদের ওপর। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রতি তিন শিশুর মধ্যে দুই শিশু “ফুড পভার্টি” বা পুষ্টিহীন খাদ্য সংকটে ভুগছে। প্রায় এক কোটি শিশু প্রয়োজনীয় পাঁচটি খাদ্যগোষ্ঠীর খাবারই পাচ্ছে না। প্রতি পাঁচ শিশুর একজন চরম খাদ্য সংকটে আছে, যারা দিনে এক বা দুই ধরনের খাবারেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ শিশুর শরীর যেমন অপুষ্টিতে বেড়ে উঠছে, তেমনি মস্তিষ্কও প্রয়োজনীয় বিকাশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন তার শিশুরা পুষ্টির বদলে রাসায়নিক খেয়ে বড় হয়।

আমরা প্রায়ই বলি—“আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা সেই ভবিষ্যৎকে প্রতিদিন অল্প অল্প করে বিষ খাইয়ে বড় করছি। স্কুলগামী শিশুদের টিফিনে থাকছে অতিরিক্ত চিনি, রঙ, ট্রান্সফ্যাট আর নিম্নমানের তেল। বাজারের ফল দেখতে বিদেশি মডেলের মতো চকচকে, কিন্তু ভেতরে বিষাক্ত রাসায়নিকের আস্তরণ। শিশুদের শরীরে এর প্রভাব পড়ছে ভয়াবহভাবে- স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত সমস্যা, মনোযোগ ঘাটতি, কিডনি জটিলতা এমনকি অল্প বয়সে লিভারের সমস্যাও বাড়ছে।

নারীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গর্ভকালীন পুষ্টিহীনতা, দূষিত খাবার, বিষাক্ত রাসায়নিক ও অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে মাতৃস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের অভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অপুষ্ট মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশু পরবর্তীতে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তার সংকট শুধু স্বাস্থ্যগত নয়; এটি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও বড় হুমকি।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতি বা স্টান্টিং এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। একটি গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ৩১ শতাংশ শিশু স্টান্টিংয়ের শিকার। অর্থাৎ তারা বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর অর্থ কেবল কম উচ্চতা নয়; এর অর্থ হলো দুর্বল মেধা, কম শেখার ক্ষমতা, কম কর্মদক্ষতা এবং ভবিষ্যতে কম উৎপাদনশীল নাগরিক। সহজ ভাষায় বললে, অপুষ্ট ও অনিরাপদ খাদ্য একটি জাতির “ব্রেইন পাওয়ার” ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়।

অথচ এই পরিস্থিতির মাঝেও আমাদের সমাজে এক ধরনের ভয়ংকর স্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন বাজারে গিয়ে ফল কিনে বাড়িতে এনে আধাঘণ্টা লবণ পানিতে ভিজিয়ে রেখে নিজেকে বিজ্ঞানী ভাবেন। কেউ কেউ আবার বলেন, “এই দেশে খাঁটি খাবার খুঁজতে গেলে না খেয়েই মারা যেতে হবে!” ব্যঙ্গ হলেও কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা নয়।

আরও মজার ব্যাপার হলো, খাদ্যে ভেজাল নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি হয় রমজানে। তখন হঠাৎ করে অভিযান শুরু হয়, কিছু ক্যামেরাবান্ধব জরিমানা হয়, দু-একটি দোকানে তালা পড়ে, তারপর ঈদের চাঁদের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্বেগও আকাশে মিলিয়ে যায়। যেন খাদ্যে ভেজালও মৌসুমি ফল!

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে দেশে আইন আছে, কর্তৃপক্ষ আছে, অভিযান আছে, সেমিনার আছে, দিবসও আছে। নেই শুধু ধারাবাহিকতা, কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। গবেষণাগুলো বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছে যে বাংলাদেশে খাদ্যশৃঙ্খলের প্রায় প্রতিটি স্তরেই দূষণ ও ভেজালের সমস্যা রয়েছে, যা ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আমরা এখন এমন এক সমাজে পৌঁছেছি, যেখানে মানুষ হাসপাতালের বিল নিয়ে যতটা চিন্তিত, খাবারের মান নিয়ে ততটা নয়!

সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত এখানেই- আমরা এখনও খাদ্য নিরাপত্তাকে “জাতীয় সংকট” হিসেবে দেখতে শিখিনি। অথচ এটি নিছক স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, মানবসম্পদ ও জাতীয় উন্নয়নের প্রশ্ন। অপুষ্ট, অসুস্থ ও দুর্বল জনগোষ্ঠী নিয়ে কখনোই একটি শক্তিশালী জাতি গড়ে ওঠে না।

একসময় বলা হতো, “ভাতে-মাছে বাঙালি।” এখন হয়তো বলতে হবে “কেমিক্যালে-কেমিক্যালে বাঙালি।” কারণ আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে খাবার শুধু পেট ভরাচ্ছে না; ধীরে ধীরে শরীর, মেধা এবং ভবিষ্যৎও নষ্ট করছে। প্রশ্ন হলো, এভাবে আর কতদিন? খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কি সত্যিই কেউ চিন্তিত? নাকি আমরা অপেক্ষা করছি এমন এক দিনের জন্য, যেদিন বিশুদ্ধ খাবার জাদুঘরে রাখা হবে আর শিশুরা বইয়ে পড়বে “একসময় মানুষ সত্যিকারের ফল-মূল খেত!”

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।