দিনভর হাজারো যাত্রীর পদচারণা, লঞ্চের হুইসেল, কুলিদের হাঁকডাক, পণ্য ওঠানামার ব্যস্ততা আর মানুষের কোলাহলে মুখর থাকে পুরান ঢাকার সদরঘাট। দেশের অন্যতম বৃহৎ নৌ-টার্মিনালটির চিত্র রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় একেবারে। দোকানের শাটার নামে, যাত্রীর সংখ্যা কমে আসে, স্তিমিত হয়ে পড়ে দিনের ব্যস্ততা। তখন সদরঘাটের ফুটপাত, জেটি, টার্মিনালের বারান্দা, সিঁড়ি এবং বুড়িগঙ্গার তীরজুড়ে নেমে আসে আরেকটি নীরব বাস্তবতা।

‎সারি সারি শুয়ে পড়েন শত শত গৃহহীন মানুষ। কেউ পুরোনো চট বিছিয়ে, কেউ পলিথিনের ওপর, আবার কেউ ছেঁড়া একটি কম্বল গায়ে জড়িয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করেন। মাথার ওপরে কোনো ছাদ নেই, নেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। তবুও খোলা আকাশের নিচেই তাদের দিনশেষের আশ্রয়।

সদরঘাটে রাত কাটানো মানুষের অধিকাংশই দিনমজুর, কুলি, নৌ-শ্রমিক, রিকশাচালক, হকার কিংবা ভাসমান শ্রমজীবী। অনেকেই নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে রাজধানীতে এসেছেন। কেউ কাজের সন্ধানে এসে আর ফিরে যেতে পারেননি, আবার কেউ পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণে বছরের পর বছর ফুটপাতকেই নিজের ঠিকানা বানিয়েছেন।

‎শুধু প্রাপ্তবয়স্করাই নন, তাদের পাশেই ঘুমিয়ে থাকে অসংখ্য পথশিশু। সারাদিন প্লাস্টিক, বোতল কিংবা কাগজ কুড়িয়ে, ফুল বিক্রি করে বা ভিক্ষা করে যে সামান্য অর্থ জোটে, তা দিয়ে কোনোমতে খাবারের ব্যবস্থা হয়। এরপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে খোলা আকাশের নিচেই ঘুমিয়ে পড়ে তারা।

‎প্রকৃতির প্রতিকূলতাও যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। বর্ষায় বৃষ্টিতে ভিজে, শীতে কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে আর গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরমে অস্থির হয়ে রাত কাটে তাদের। অসুস্থ হলেও চিকিৎসার সুযোগ মেলে না। অনেকেই রাতে চুরি, ছিনতাই কিংবা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। তবুও ভোর হলেই নতুন দিনের আশায় আবার জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন।

‎সদরঘাটে আশ্রয় নেওয়া ৬০ বছর বয়সী এক গৃহহীন বৃদ্ধ বলেন, “রাত হলে সবাই নিজের ঘরে ফিরে যায়। আর আমি ফুটপাতে শুয়ে আকাশ দেখি। অনেক বছর হলো নিজের বলে কোনো ঘর নেই। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়, যখন বৃষ্টির রাতে মাথা লুকানোর জায়গাটুকুও থাকে না।”

‎প্রায় ১০ বছর বয়সী এক পথশিশুর চোখে ধরা পড়ে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের বেদনা। সে বলে, “লঞ্চে করে কত বাচ্চা বাবা-মায়ের হাত ধরে আসে। তাদের দেখে ভাবি, আমারও যদি একটা পরিবার থাকত! আমিও যদি স্কুলে যেতে পারতাম!”

‎এক ভাসমান শ্রমিক বলেন, “আমরা ভিক্ষা করতে চাই না। একটা নিয়মিত কাজ আর নিরাপদে ঘুমানোর জায়গা পেলে জীবনটা বদলে যেত।”

‎আরেক গৃহহীন বৃদ্ধা বলেন, “সবচেয়ে ভয় লাগে অসুস্থ হলে। তখন পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকে না। মনে হয়, এই ফুটপাতেই একদিন চোখ বন্ধ হয়ে যাবে।”

‎বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণায় উঠে এসেছে, দারিদ্র্য, নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং নগরমুখী মানুষের চাপ রাজধানীতে ভাসমান ও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। শীতকালে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কম্বল ও খাবার বিতরণ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

‎সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, গৃহহীনতা কেবল দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, কর্মসংস্থান এবং মানবিক মর্যাদার সংকটেরও প্রতিফলন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের জন্য স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থানের সুযোগ, পথশিশুদের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

‎দিনের ব্যস্ত সদরঘাট রাতের অন্ধকারে যেন আরেকটি বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে—যেখানে শত শত মানুষ প্রতিদিন আকাশকে ছাদ বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। তাদের স্বপ্ন খুব বড় নয়; একটি নিরাপদ আশ্রয়, দুবেলা খাবার আর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।