তিস্তাপাড়ের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন “তিস্তা মহাপরিকল্পনা”, যে স্বপ্ন পূরণ হলে দূর হবে তাদের যুগ যুগ ধরে চলমান কষ্ট; সমৃদ্ধ হবে জীবন, জীবিকা, কৃষি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। আর এই স্বপ্ন পূরণেই তারা সময়ে গড়ে তুলেছে নানা আন্দোলন, সমাবেশ ও প্রতিবাদ মিছিল। এ যেন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলার মানুষের বাঁচার আঁকুতি, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে রাষ্ট্রের কাছে তাদের অসহায় চাহনি।
প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো তিস্তা নদী ভারতের সিকিমের চিতামু হ্রদ থেকে উৎপত্তি হয়ে, পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার বুক চিড়ে তিস্তা মিশেছে ব্রহ্মপুত্র নদে। দেশের অন্যান্য নদীগুলোর মতোই তিস্তা নদীও নদীতীরের মানুষগুলোর জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু এই নদীর পানি তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনে প্রতিবছরই দুঃখ ডেকে আনে। শুকনো মৌসুমে নদী শুকিয়ে রীতিমতো বালুচরে রূপান্তরিত হয় আর বর্ষা মৌসুমে বন্যার উপচে পড়া পানিতে টইটম্বুর হয়ে যায় বাড়িঘর, ক্ষেত, খামার ইত্যাদি। এই দ্বৈত সংকটে অভাবনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয় পাঁচটি জেলার লাখ লাখ মানুষ। আর সংকটের এমন তীব্রতার পেছনে রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নদী শাসনের অংশ গজলডোবা ব্যারেজ। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সীমান্তের ৬০ কিলোমিটার উজানে তিস্তা নদীতে এই বাঁধ নির্মাণ করে ভারত সরকার।
তিস্তার পানি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগের সময়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও আলোচনায় আসে তিস্তা সংকট। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি অস্থায়ী পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার আওতায় বাংলাদেশ ৩৬% ও ভারত তিস্তার পানির ৩৯% পাওয়ার কথা ছিল। তবে চুক্তিটি কার্যকর হয়নি। তাই ২০১১ সালে দুই দেশের প্রচেষ্টায় নতুন একটি চুক্তির খসড়া প্রণয়ণ করা হলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতার জেরে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। এরপর ২০১৪ সালে ভারত একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে, অর্থাৎ বাংলাদেশ অংশে পানি দেয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে খরা ও বর্ষায় বন্যার মতো সংকটের সৃষ্টি হয়, যা কেড়ে নেয় লাখো মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, সেচ সুবিধা ও জীবিকা। তাই তিস্তা সংকট দূর করতে ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের কৃষি, অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার চীনের সহযোগিতায় “তিস্তা মহাপরিকল্পনা” বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন অব চায়না বা পাওয়ার চায়নার মধ্যে একই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় মূলত বাংলাদেশে তিস্তার প্রায় ১০২ কিলোমিটার অংশ খননের মাধ্যমে ১০ মিটার গভীর করা হবে, দুই পাড়ে বাঁধ দিয়ে প্রায় ২০৩ কিলোমিটার তীর রক্ষা করা হবে, এবং চর উদ্ধার করে প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার ফসলি জমি তৈরি করা হবে। এছাড়া দুই তীরে আধুনিক স্যাটেলাইট শহর, হোটেল, সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন ও নদী ভাঙনে গৃহহারাদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প যার অফিসিয়াল নাম “কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট”।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষের দুঃখ দুর্দশার অবসান ঘটবে। তিস্তার পানির জন্য ভারতের উপর নির্ভরশীলতা কমবে, পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, নদীভাঙন বন্ধ হবে, বন্যা ও খরায় ফসলের ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ও শিল্পায়নের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। লাখো মানুষের কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে। সাথে পর্যটন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সমৃদ্ধ হবে।
কিন্তু এই প্রকল্প হাতে নেওয়ার পূর্বে বাংলাদেশকে বিবেচনা করতে হবে তিস্তা সংশ্লিষ্ট ভারত ও চীনের ভূরাজনীতি। এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক থেকেও দ্রুত উন্নয়নশীল। নানা সময়ে সীমান্ত ও রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। তিস্তা নদীর অবস্থান ও চীনের সহযোগিতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে ভারত তাদের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। কারণ বাংলাদেশ অংশের তিস্তা নদী ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন্স নেকের খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার সুবাদে দীর্ঘদিন এই স্থানে চীনের উপস্থিতি ভারতের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি। তাই ভারত চাইবে না তিস্তা প্রকল্প চীনের সহায়তায় বাস্তবায়ন হোক।
অন্যদিকে চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশ নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করছে। বাংলাদেশেও চীনের সহায়তায় অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। যদিও কিছু প্রকল্পে আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অর্থায়নে তৈরি অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এছাড়াও চীনের ঋণফাঁদ নিয়েও রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ। কারণ, চীনের প্রতিশ্রুত অনেক প্রকল্পই অর্থ না পাওয়ার দরুণ ধীরগতির সম্মুখীন হয়েছে।
প্রসঙ্গত, যদিও চীন নদী ব্যবস্থাপনায় অনেক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তবে চীনের নদী আর বাংলাদেশের নদীগুলোর ভৌগোলিক আচরণ, বৈশিষ্ট্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। তাই চীনের কারিগরি সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর উদ্ভূত নতুন কোনো সংকটের সম্মুখীন বাংলাদেশ হয় কি না, এটা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।
পাশাপাশি, ভারতের সাথে পানি বণ্টন চুক্তি না করে অর্থাৎ ভারতের কাছ থেকে পানি আদায় না করে যদি বাংলাদেশ অংশে তিস্তাকে কাটছাঁট করা হয়, তবে পানির সংকট কতটুকু মোকাবেলা করা সম্ভব এ বিষয়েও স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
তবুও, আশায় বুক বাঁধছে বাংলাদেশ। কেননা, তিস্তা সংকট সমাধানের বহু চেষ্টা করা হলেও নিরসন করা সম্ভব হয়নি। তাই নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধানের পথে হাঁটাকেই উপযুক্ত বলে মনে করছে বাংলাদেশের মানুষ। এক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতায় একাধিক বড় প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন ও সুফল ভোগের উদাহরণ টেনে, আশার আলো জ্বালানো যায়। কারণ, চীনের সহায়তায় কর্ণফুলী টানেল সফলভাবে চালু হয়েছে, টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কিং আধুনিকায়নের কাজ চলমান রয়েছে। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আশা করা যায় জনদুর্ভোগ লাঘব হবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনে সফর শেষে দেশে ফিরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বেইজিং সফরকালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৭টি সমঝোতার মধ্যেও উঠে এসেছে তিস্তা প্রসঙ্গ; ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত নিজেই জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অনুরোধে চীন এই প্রকল্পে কাজ চালিয়ে যাবে, তবে তার আগে বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং। তাই আবারও দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনা ভেঙে সামনে এসেছে তিস্তা সংকট এবং এর সমাধান হিসেবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা।
তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। এক সময় ভারতও এই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছিল, যা এখনও পুরোপুরি টেবিলের বাইরে নয়। ফলে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ থাকছে দুই পরাশক্তির স্বার্থের টানাপোড়েনের মধ্যে নিজের অগ্রাধিকার ঠিক রাখা। তবু, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন মোড় নেওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। নির্ভরশীলতাকে উতরানোর দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্ত করা সম্ভব হবে আর সেই সঙ্গেই হয়তো লেখা হবে তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা।
লেখক- মোঃ আঙ্গুর মিয়া, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৯:৩৩ অপরাহ্ণ