অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান Commonwealth Scientific and Industrial Research Organisation (CSIRO) এবং দেশটির শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি)। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাস্তবায়িত হলে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-১-এর কনফারেন্স কক্ষে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া সফর-পরবর্তী ব্রিফিং সেশনে এসব সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। সেশনে সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী।

সভায় উপাচার্য বলেন, বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন শুধু পাঠদান বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও সমানভাবে নির্ভর করে। অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় রাবিপ্রবির জন্য বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত হয়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে শিক্ষক ও গবেষকরা আধুনিক গবেষণা পদ্ধতি, উন্নত গবেষণাগার এবং বৈশ্বিক গবেষণা অর্থায়নের সুযোগ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মানোন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সুযোগও বাড়বে।

উপাচার্য আরও বলেন, গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার সমাধান এবং আঞ্চলিক উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নবিষয়ক গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সফরসঙ্গী ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. নিখিল চাকমা এবং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সপ্তর্ষি চাকমা পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

তারা জানান, CSIRO-এর গবেষণা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে গবেষণার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বন ও পরিবেশ, ইকোসিস্টেম ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি প্রযুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো বিষয়ে যৌথ গবেষণার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ড্রাগ ডিসকভারি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, স্মার্ট কৃষি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনসহ সমসাময়িক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সহযোগিতার সুযোগের কথা তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকার এবং সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। গবেষণার ফলাফল দ্রুত বাস্তব প্রয়োগে নিয়ে যাওয়ার কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। রাবিপ্রবিও ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সফরকালে প্রতিনিধিদল University of Melbourne, Deakin University, Monash University, Griffith University, University of New South Wales (UNSW), University of Wollongong এবং Charles Darwin University পরিদর্শন করে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র, উদ্ভাবন ল্যাব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ইউনিট এবং একাডেমিক প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

উপস্থাপনায় বলা হয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে যৌথ গবেষণা প্রকল্প, গবেষণা ফেলোশিপ, গবেষক বিনিময়, যৌথ প্রকাশনা, অনলাইন গবেষণা প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি বিদেশি গবেষকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।

বক্তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদারত্ব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করবে না; বরং স্থানীয় সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

সমাপনী বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী বলেন, অস্ট্রেলিয়া সফরের মাধ্যমে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে বাস্তব গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রস্তাব তৈরির পাশাপাশি বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার আহ্বান জানান।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় এবং CSIRO-এর মতো আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্বের মাধ্যমে রাবিপ্রবি গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।