জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলমান থাকলেও এর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই প্রায় ২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক পুনর্নির্মাণ, ফুটপাত ও পৃথক সাইকেল লেন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কমিটির (টিএমসি) সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্পটির পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের মতামত বা পরামর্শ নেওয়া হয়নি।
অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হবে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর।
তবে মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বড় ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনাবিদ শিক্ষক ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা। তাদের আশঙ্কা, সড়ক, পানি নিষ্কাশন, যানবাহন চলাচল, জলাশয় ও সবুজ অঞ্চলকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা না করে পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ভবিষ্যতে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
টিএমসি কমিটির একাধিক সদস্য জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিকল্পনার সঙ্গে সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে মাস্টারপ্ল্যানের নকশার সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া নির্মাণকাজ করা হলে পরবর্তীতে পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ সংশোধন বা পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। প্রকল্পটির আগে কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা সমন্বিত মূল্যায়ন হয়েছে কি না, সে বিষয়েও তারা অবগত নন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি অদ্রি অংকুর বলেন, “জাহাঙ্গীরনগরের রাস্তা, জলাশয়, বনাঞ্চল ও অন্যান্য অবকাঠামো একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্রের অংশ। একটি জায়গায় অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ অন্য জায়গায় কী প্রভাব ফেলবে, তা বিবেচনা করেই উন্নয়ন করা উচিত।”
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের অন্য অংশের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ইমন বলেন, “আমরা ফুটপাত বা নিরাপদ চলাচলের বিরোধিতা করছি না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কি প্রতিটি প্রশাসনের আলাদা প্রকল্পে হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি একটি মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে হবে?”
তিনি বলেন, “জাহাঙ্গীরনগরের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রাণ-প্রকৃতি। উন্নয়নের নামে গাছ কাটা বা প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না।”
জাবি ছাত্রফ্রন্টের সংগঠক সজীব আহমেদ জেনিচ বলেন, “মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেটিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। অতীতের মতো অবকাঠামোকেন্দ্রিক অপরিকল্পিত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে চাই না।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা হয়নি। নির্মাণকাজে ক্যাম্পাসের কোনো গাছ বা প্রাণ-প্রকৃতির ক্ষতি হলে তার দায় প্রশাসনকে নিতে হবে।”
এ বিষয়ে জাকসুর পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক সম্পাদক শাফায়েত মীর বলেন, “শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমানো ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এখন কাজ শুরু না হলে বরাদ্দের অর্থ সরকারের কোষাগারে ফেরত যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ার বিষয়টি আগে জানা ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কাজ চলমান রেখেই টিএমসি কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের দাবি জানাব।”
জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। নির্মাণকাজে পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ