চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সবুজ ক্যাম্পাসে সময়ের সঙ্গে অনেক মানুষ এসেছেন, চলে গেছেন। তাঁদের কেউ শিক্ষক, কেউ কর্মকর্তা, কেউ শিক্ষার্থী। আবার এমন কিছু মানুষও ছিলেন, যাঁদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদ বা পরিচয় ছিল না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল দীর্ঘস্থায়ী।

তেমনই একজন ছিলেন চবিয়ানদের পরিচিত ‘মউ মামা’—গুরা মিয়া। রেলস্টেশনের বিপরীত দিকে থাকা খোলামেলা ‘মউর দোয়ান’-এর সাধারণ দোকানদার ছিলেন তিনি। তবে শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর পরিচয় শুধু একজন দোকানদার হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। অসহায় ও অর্থকষ্টে থাকা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ক্যাম্পাসের পরিচিত এক মুখ। আজ তাঁর নবম মৃত্যুবার্ষিকী।

অর্থকষ্টে শিক্ষার্থীদের পাশে

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়তে আসতেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাসের শেষ দিকে অনেকেরই পকেট খালি হয়ে যেত। কখনো মেস বা হলের মিল বন্ধ হয়ে যেত, আবার শহর থেকে শাটল ট্রেনে নেমে ক্ষুধার্ত অবস্থায় অনেক শিক্ষার্থীকে পড়তে হতো। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের অন্যতম ভরসার জায়গা ছিল ‘মউর দোকান’।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারও কাছে খাবারের টাকা না থাকলে মউ মামা তাঁকে ফিরিয়ে দিতেন না। সামর্থ্য অনুযায়ী বিনা মূল্যে খাবার খাওয়াতেন। শুধু খাবার দেওয়ার মধ্যেই তাঁর সহযোগিতা সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক অসহায় শিক্ষার্থীর পড়ালেখার খরচও তিনি গোপনে বহন করেছেন। কারও ফরম পূরণের টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

তাঁর সাধারণ দোকানটি তাই অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শুধু খাবারের জায়গা ছিল না; প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা পাওয়ার একটি নির্ভরতার জায়গাও ছিল।

একই দিনে দুই মৃত্যু

২০১৭ সালে অসুস্থ হয়ে মারা যান মউ মামা। তাঁর মৃত্যুর দিনই ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। স্বামীর মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে তাঁর সহধর্মিণীও সেদিন কাঁদতে কাঁদতে মৃত্যুবরণ করেন।

পরপর এই দুই মৃত্যু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ পুরো ক্যাম্পাসে শোকের আবহ তৈরি করেছিল। তাঁদের দাম্পত্য জীবনের এই পরিণতি দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে থেকে যায়।

স্মৃতিতে মউ মামা

মউ মামার মৃত্যুর নয় বছর পূর্ণ হলো। সময়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে। রেলস্টেশনের আশপাশের চিত্রও বদলেছে। বদলেছে শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রা ও ক্যাম্পাসের পরিবেশ।

তবে পুরোনো শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে এখনো রয়ে গেছেন মউ মামা। নব্বইয়ের দশক থেকে পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা বহু শিক্ষার্থীর জীবনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পাঠ্যবইয়ে হয়তো তাঁর নাম নেই। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদও তাঁর ছিল না। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানো একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে তিনি আজও পরিচিত। আমাদের প্রিয় মউ মামার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও অশেষ ভালোবাসা।

লেখক : মহিউদ্দিন টিপু
সাবেক শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়