দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ১৩২.৬১ মেগাওয়াট-পিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা, যৌক্তিক ট্যারিফ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার আহ্বান জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির মতে, পরিকল্পিতভাবে অব্যবহৃত ছাদ ও উপযুক্ত স্থান ব্যবহার করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ক্যাব ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সহযোগিতায় আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
কোথায় কত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা:
সংলাপে উপস্থাপিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৩১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৫২.৫০ মেগাওয়াট-পিক, ১৫০টি কলেজ এলাকায় ৫১.১২ মেগাওয়াট-পিক, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৪.৬৩ মেগাওয়াট-পিক এবং শৈলকুপা পৌর এলাকায় ৪.৩৬ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বক্তারা বলেন, জমির সীমাবদ্ধতা ও ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা, হাটবাজার এবং উপযুক্ত জলাশয় ব্যবহার করে নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪ টাকা ১০ পয়সা:
সংলাপে উপস্থাপিত মূল্যায়নে বলা হয়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৪ পয়সা, কলেজ এলাকায় ৪ টাকা ১৫ পয়সা এবং রাজশাহী মহানগরে ৪ টাকা ৪ পয়সা হতে পারে। শৈলকুপা পৌর এলাকায় ছাদভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ৪ টাকা এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ৪ টাকা ৭৫ পয়সা প্রাক্কলন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গড় উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতি ইউনিট প্রায় ৪ টাকা ১০ পয়সা।
প্রস্তাবিত পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক (ওপেক্স) মডেলে বিনিয়োগকারী সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও পরিচালনায় অর্থায়ন করবেন। উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে তিনি বিনিয়োগ ফেরত নেওয়া এবং মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাবেন। এতে গ্রাহক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শুরুতেই বড় অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগের প্রয়োজন কমবে।
প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো থেকে প্রথম বছরে প্রায় ১৯ কোটি ৩০ লাখ ইউনিট এবং ২০ বছরে প্রায় ৩৭০ কোটি ৩০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। প্রকল্পগুলোর প্রকৌশল, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৩১ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য ৭ টাকা ৫০ পয়সা ধরে ২০ বছরে সম্ভাব্য মোট বিক্রয়মূল্য প্রায় ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা হতে পারে।
বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও নীতিগত স্থিতিশীলতার দাবি:
সংলাপে অংশ নেওয়া বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক রিটার্ন, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সরকারি সংস্থার সহযোগিতা এবং নির্ধারিত ট্যারিফ ও প্রণোদনার ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জবাবে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি জোরদার, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি কমিটি বা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও আলোচনায় উঠে আসে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ জরুরি:
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি ও আমদানিনির্ভরতা মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
তিনি জানান, গত ১২ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্র অনুমোদিত হয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কর-সুবিধা ও প্রণোদনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত চার মাসে এ খাতে ৮ হাজার ৩৩৬ জন নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংলাপে ২০২৭ সালের মধ্যে গ্রিড বিদ্যুতের চাহিদা ২০ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য তুলে ধরা হয়। উপস্থাপিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রথম বছরে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০২ টন এবং ২০ বছরে প্রায় ২৩ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
যুবসমাজকে যুক্ত করার প্রস্তাব:
স্থানীয় পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ ও দক্ষ জনবল তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে প্রশিক্ষণ এবং সেবা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সোলার শপ অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার’ স্থাপনের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
সভাপতির বক্তব্যে বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও বিদ্যুৎ চুরি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মুনাফার পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে স্বচ্ছ চুক্তি, যৌক্তিক ট্যারিফ, বিনিয়োগ সুরক্ষা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও স্বাধীন পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও যুবসমাজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
এম/আর
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৪২ অপরাহ্ণ