১১ বছরেও খোঁজ নেই জবির তিন শিক্ষার্থীর: অপেক্ষা, আশঙ্কা আর ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রদলকর্মী—আসাদুজ্জামান রানা, মাজহারুল ইসলাম রাসেল ও আল আমিন—নিখোঁজ হওয়ার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ১১ বছর। ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও আজও তাদের কোনো সন্ধান মিলেনি। সময় থমকে আছে তিন পরিবারের কাছে, থমকে আছে স্বজন হারানোর বেদনায়।
তিনটি পরিবারের দাবি, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন—সেদিন সাদা পোশাকে থাকা একদল লোক র্যাবের একটি গাড়িতে করে ছয়জনকে তুলে নিয়ে যায়, যাদের মধ্যে এই তিন শিক্ষার্থীও ছিলেন। তবে শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ঘটনার পরপরই মুগদা, বাড্ডা ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পৃথক তিনটি সাধারণ ডায়েরি করা হলেও তদন্ত এগোয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনজনের কারও নামে কোনো মামলা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তারা এবং রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।
স্বপ্নময় শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া,
নিখোঁজ তিন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও বন্ধুত্বও ছিল প্রায় একই সময়ের। রানা ছিলেন দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী, আর রাসেল ও আল আমিন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৫–০৬ সেশনের ছাত্র।
ছাত্ররাজনীতিতে ঘনিষ্ঠতা এবং একসঙ্গে ক্যাম্পাস-রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা—এই বন্ধনের ওপরই দাঁড়িয়েছিল তাদের সম্পর্ক।
পরিবারগুলোর অভিযোগ ও অসহায় অপেক্ষা-
রাসেলের বড় ভাই মশিউর রহমান বলেন,
“রাসেলের কোনো অপরাধ ছিল না। রাজনৈতিক কারণে তাকে টার্গেট করা হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন র্যাবের গাড়ি ছিল সেদিন। ১১ বছর ধরে আমরা শুধু অপেক্ষা করছি।”
শেরপুরের নকলা উপজেলার মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন রাসেল, থাকতেন তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায়।
আল আমিনের ছোট ভাই রুহুল আমিন জানান,
“আমার ভাই বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। ভাইভা দেওয়ার আগেই গুম হয়ে যায়। মামলা করেছিলাম, পরে ভয় পেয়ে তুলে নিতে হয়।”
রানার বড় বোন মিনারা বেগম বলেন,
“রানা আমাদের পরিবারের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পথে ছিল। নিখোঁজ হওয়ার পর মানববন্ধন করেছি, পুলিশ-র্যাবের কাছে গেছি—কোথাও কোনো খোঁজ পাইনি।”
ক্যাম্পাসে স্মরণ, পরিবারে ক্ষতচিহ্ন-
নিখোঁজের পরবর্তী বছরগুলোতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দফায় আলোচনায় এসেছে বিষয়টি। সর্বশেষ শেরপুর জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের এক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা রাসেলের খোঁজ চান।
পরিষদের সভাপতি ওবায়দুল ইসলাম বলেন,
“রাসেল জবির পরিচিত মুখ ছিল। আমরা চাই সরকার জানাক—সে কোথায় আছে।”
রাসেলের ছোট ভাই ও বর্তমান জবি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল তানভীর বলেন,
“নয় বছর ধরে পরিবার শুধু দিন গুনছে। গুম-খুনের রাজনীতি আর ফিরুক—এটা চাই না।”
প্রধান অতিথি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রাজ্জাক বলেন,
“রাসেলকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তার অনুপস্থিতির কথা শুনে মন ভারী হয়ে গেল।”
জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল অভিযোগ করেন,
“বিএনপির অবরোধ কর্মসূচির প্রস্তুতির সময় সেদিন র্যাব তাদের তুলে নেয়—সেদিনের প্রত্যক্ষ বিবরণ এমনটাই। আজও তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।”
মানবাধিকার সংগঠনের দাবি-
মানবাধিকারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’–এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন,
“গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছে। সরকারকে অবশ্যই তথ্য দিতে হবে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।”
১১ বছরের অপেক্ষা—অনিশ্চয়তার দেয়ালে ভর দিয়ে
দিন পেরোয়, বছর ফুরোয়—কিন্তু ফেরার পথে কোনো আলোর দ্যুতি নেই। স্বজনেরা আজও জানেন না, তাদের সন্তান–ভাই–বন্ধুরা কোথায় আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না। প্রশ্ন একই—একজন মানুষ এভাবে কোথায় হারিয়ে যান? রাষ্ট্রের কাছে কি কোনো তথ্য নেই?
তবে হতাশার ভেতরেও টিকে আছে একফোঁটা প্রত্যাশা—
একদিন হয়তো কোনো খবর পাওয়া যাবে। অথবা কমপক্ষে জানা যাবে—তারা কোথায়। প্রতীক্ষা তাই এখনও থেমে নেই।








আপনার মতামত লিখুন