হাইব্রিড টিচিং-পদ্ধতি : উচ্চশিক্ষায় কেন আবার ফিরছে চক-ডাস্টারের রাজত্ব?
ড. ইকবাল আহমেদ
একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জনপ্রিয় শিক্ষককে চেনা যেত তাঁর বোর্ডভর্তি সমীকরণ, চকভাঙা আঙুল আর ক্লাস শেষে ডাস্টারে সাদা হয়ে যাওয়া শার্ট দেখে। পরে প্রযুক্তির ঝড় এলো। স্মার্ট বোর্ড, মাল্টিমিডিয়া, থ্রিডি অ্যানিমেশন, অনলাইন লেকচার, স্লাইড, পিডিএফ সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হলো যেন শিক্ষা এখন পুরোপুরি “ডিজিটাল” হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই তখন প্রায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, “চক-ডাস্টারের দিন শেষ!”
কিন্তু আজকের বাস্তবতা অন্যরকম। পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আবার বুঝতে শুরু করেছে, শুধু ঝকঝকে স্লাইড দিয়ে শিক্ষার্থীদের মন জয় করা গেলেও, ডিটেইলস জ্ঞান, কিংবা শেখার গভীরতা নিশ্চিত করা যায় না। ফলে উচ্চশিক্ষায় আবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে “হাইব্রিড টিচিং-পদ্ধতি”; অর্থাৎ চক-ডাস্টার, হোয়াইটবোর্ড, সরাসরি ব্যাখ্যা এবং স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার।
কারণ শিক্ষা কখনও শুধু তথ্য দেখানোর বিষয় নয়; এটি চিন্তা তৈরি করার প্রক্রিয়া। আর চিন্তা তৈরি হয় ধীরে ধীরে, প্রশ্নের ভেতর দিয়ে, বোর্ডে ভুল করতে করতে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর চোখে চোখ রেখে আলোচনা করতে করতে। পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইড অনেক সময় তথ্য দেখায়, কিন্তু বোর্ডে ধাপে ধাপে একটি ধারণা গড়ে ওঠার দৃশ্য শিক্ষার্থীদের “ভাবতে শেখায়”। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রকৌশল শিক্ষার্থী যখন একটি অ্যালগরিদম বোঝে, একজন পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যখন সমীকরণের উৎস ধরতে শেখে, কিংবা একজন অর্থনীতির শিক্ষার্থী যখন একটি গ্রাফের পেছনের যুক্তি বিশ্লেষণ করে তখন শুধু “ফাইনাল স্লাইড” দেখলে হয় না; পুরো চিন্তার যাত্রাটা দেখতে হয়। আর সেই জায়গাতেই বোর্ডভিত্তিক শিক্ষাদানের শক্তি এখনও অপরিসীম।
মজার বিষয় হলো, উন্নত বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও এখন “স্লাইড-ক্লান্তি” নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের MIT, Harvard University কিংবা যুক্তরাজ্যের University of Cambridge-এর বহু শিক্ষক এখনও বোর্ডভিত্তিক শিক্ষাদানকে অত্যন্ত কার্যকর মনে করেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জটিল গণিত, তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞান কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাসে শিক্ষকরা ইচ্ছাকৃতভাবেই ধীরে ধীরে বোর্ডে লিখে পড়ান, যাতে শিক্ষার্থীরা চিন্তার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করতে পারে। জাপানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও বোর্ডভিত্তিক ব্যাখ্যার সংস্কৃতি অত্যন্ত শক্তিশালী। কারণ তাদের বিশ্বাস, দ্রুত স্লাইড বদলানোর চেয়ে ধীরে ধীরে বোর্ডে ধারণা গড়ে তোলা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ায়। অন্যদিকে ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা- যাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ধরা হয়; সেখানে প্রযুক্তিকে কখনও শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে দেখা হয় না; বরং “সহযোগী উপকরণ” হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এছাড়াও, কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই উপলব্ধি আরও স্পষ্ট হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের সময় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বুঝতে পেরেছে, প্রযুক্তি জরুরি হলেও শুধুমাত্র স্ক্রিনভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্লাইড দেখার ফলে মনোযোগ কমে যায়, অংশগ্রহণ কমে যায়, এমনকি শেখার প্রতি আবেগও হারিয়ে যেতে থাকে। অনেকে এখন মজা করে বলে, “স্লাইড দেখে ডিগ্রি পাওয়া যায়, কিন্তু বোঝাপড়া হয় বোর্ড দেখে।”
আসলে আমাদের ছাত্রদের মস্তিষ্ক এখনও পুরোপুরি “প্রেজেন্টেশন-ফ্রেন্ডলি” হয়ে ওঠেনি। একটি স্লাইডে দশটি পয়েন্ট একসঙ্গে দেখালে শিক্ষার্থী হয়তো ছবি তুলে রাখে, কিন্তু বোর্ডে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করলে সে চিন্তার সঙ্গে তাল মেলাতে বাধ্য হয়। এই ধীরগতি শিক্ষাকে অনেক বেশি গভীর ও স্থায়ী করে, যা প্রমানিত।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে প্রযুক্তি অপ্রয়োজনীয়। বরং আধুনিক উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তির প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। একটি জটিল ইঞ্জিনের থ্রিডি সিমুলেশন, মেডিক্যাল অ্যানাটমির ভার্চুয়াল মডেল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাইভ ডেমো কিংবা ডেটা সায়েন্সের ইন্টারঅ্যাকটিভ ভিজ্যুয়ালাইজেশন- এগুলো ছাড়া আজকের শিক্ষা অসম্পূর্ণ। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রযুক্তি “সহযোগী” থেকে “প্রধান চরিত্র” হয়ে ওঠে, আর শিক্ষক ধীরে ধীরে শুধু স্লাইড অপারেটরে পরিণত হন।
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষায়ও এই ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি হচ্ছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই “স্মার্টনেস” সীমাবদ্ধ থাকে প্রজেক্টর অন করার মধ্যে। কোথাও শিক্ষকের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি আছে, কিন্তু কার্যকর প্রশিক্ষণ নেই; আবার কোথাও এত বেশি স্লাইডনির্ভরতা তৈরি হয়েছে যে শিক্ষার্থীরা নোট নেওয়া, চিন্তা করা কিংবা প্রশ্ন করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলছে। ফলে প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও শেখার গভীরতা তৈরি হচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, শিক্ষা কখনও পুরোপুরি যান্ত্রিক হতে পারে না। একজন শিক্ষক যখন বোর্ডে লিখতে লিখতে হঠাৎ থেমে গিয়ে বলেন, “এই জায়গাটা বুঝতে পারলে পুরো বিষয়টাই সহজ হয়ে যাবে”— সেই মুহূর্তটুকু কোনো অ্যানিমেশন তৈরি করতে পারে না। আবার একটি জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার অ্যানিমেটেড সিমুলেশন যে বোঝাপড়া তৈরি করে, সেটিও শুধু চক দিয়ে সম্ভব নয়। তাই আধুনিক উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ হয়তো “চক বনাম প্রযুক্তি”-র লড়াইয়ে নয়; বরং এ দুটোর বুদ্ধিদীপ্ত সমন্বয়ে।
হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে সফল শ্রেণিকক্ষ হবে সেটিই, যেখানে এক হাতে শিক্ষক চক ধরবেন, আর অন্য হাতে স্মার্ট পেন; যেখানে বোর্ডে চিন্তার জন্ম হবে, আর প্রযুক্তি সেই চিন্তাকে আরও জীবন্ত করে তুলবে। কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষা শুধু তথ্য দেওয়ার বিষয় নয়- এটি মানুষকে ভাবতে শেখানোর শিল্প।
লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।








আপনার মতামত লিখুন