চবিতে আন্তর্জাতিক শরণার্থী সম্মেলন, অংশ নিলেন দেশ-বিদেশের ১৩০ জনের বেশি প্রতিনিধি
দক্ষিণ এশিয়ায় শরণার্থী সুরক্ষার বিদ্যমান কাঠামো, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে দেশ-বিদেশের বিচারপতি, আইনবিদ, নীতিনির্ধারক, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিসহ ১৩০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দেন।
শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন ইভলভিং রিফিউজি প্রোটেকশন আর্কিটেকচারস ইন সাউথ এশিয়া (আইসারপাসা-২০২৬)’ শীর্ষক এ সম্মেলনের আয়োজন করে চবির আইন বিভাগ ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর রিফিউজি ল স্টাডিজ (বিসিআরএলএস)। এতে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। সম্মেলনটি হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের অর্থায়নে অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাকিবা নবী। প্রধান অতিথি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইউএনএইচসিআরের অ্যাসিস্ট্যান্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ (প্রোটেকশন) অ্যাস্ট্রিড ক্যাস্টেলিন, রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. নকিব মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ এবং চবির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমিন।
সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ১৯৯৬ সালের পর থেকে এ অঞ্চলে কার্যকর কোনো আঞ্চলিক শরণার্থী আইন প্রণয়ন সম্ভব হয়নি।
অ্যাস্ট্রিড ক্যাস্টেলিন বলেন, বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য না হলেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অসাধারণ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে।
রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়ে রয়েছে। অধ্যাপক ড. নকিব মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ বলেন, দেশে এখনো ‘শরণার্থী’ শব্দটির কোনো আইনগত সংজ্ঞা নেই। ফলে শরণার্থীদের সুরক্ষাব্যবস্থা মূলত নির্বাহী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী বলেন, শরণার্থীদের সুরক্ষা শুধু খাদ্য ও আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন, মানসম্মত শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান ল স্কুলের অধ্যাপক জেমস সি. হ্যাথাওয়েসহ দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। দিনব্যাপী আয়োজনে ১০টি থিমভিত্তিক সেশনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি তিনটি পোস্টার প্রেজেন্টেশন সেশন এবং শরণার্থীদের আইনি সুরক্ষা বিষয়ে ব্লাস্টের উদ্যোগে একটি বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ল’ কমিশনের চেয়ারম্যান ও আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জিনাত আরা। তিনি বলেন, শরণার্থী সুরক্ষা কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, মানবাধিকার আইন, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন ও পরিবেশগত ন্যায়বিচারের সমন্বয়ে এ বিষয়ে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। তিনি শরণার্থীদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা কামনা করেন।
সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক ড. রাকিবা নবী শরণার্থী আইনবিষয়ক গবেষণা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদ, পুরস্কার ও স্মারক বিতরণ করা হয়। দলীয় আলোকচিত্র ধারণের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।








আপনার মতামত লিখুন