জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ না হওয়া আমিন খান এখন পুলিশ ক্যাডার

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী মো. আমিন খান। ক্রিকেট ছিল তার প্রথম প্রেম, আর বিসিএস হয়ে উঠেছে নতুন গন্তব্য। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়াতে না পারার আক্ষেপকে শক্তিতে রূপ দিয়ে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। সংগ্রাম, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও আত্মবিশ্বাসের গল্পে উঠে এসেছে তার সাফল্যের পথচলা।
একসময় যার সকাল শুরু হতো ক্রিকেট মাঠে, আর দিন শেষ হতো পরের দিনের খেলার পরিকল্পনায়। ব্যাট-বলই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, ঢাকা লিগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট—প্রতিটি ধাপেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। স্বপ্ন ছিল, একদিন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামবেন। কিন্তু জীবন সব সময় পরিকল্পনা মেনে চলে না। ইনজুরি, প্রতিযোগিতা এবং সময়ের বাস্তবতা তাকে নতুন করে গন্তব্য নির্ধারণ করতে বাধ্য করে।
সেই নতুন গন্তব্যই তাকে নিয়ে আসে দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মঞ্চে। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে শুরু করতে যাচ্ছেন জীবনের নতুন অধ্যায়।
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই স্বপ্নের শুরু
আমিন খানের বেড়ে ওঠা খুলনায়। বাবা ছিলেন একজন সরকারি চাকরিজীবী। সীমিত আয়ের সংসারে বিলাসিতার সুযোগ না থাকলেও ছিল সততা, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের শিক্ষা। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সংগ্রাম তাকে বাস্তববাদী হতে শিখিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। সীমিত আয়ের মধ্যেই বড় হয়েছি। কিন্তু বাবা-মা কখনো মূল্যবোধের জায়গায় আপস করতে শেখাননি।
তিনি খুলনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং সরকারি এমএম সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। পরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিসিপ্লিনে ভর্তি হন।
ক্রিকেটই ছিল প্রথম পরিচয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই ক্রিকেট অঙ্গনে পরিচিত মুখ ছিলেন আমিন। প্রায় এক যুগ প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও ক্রিকেটই ছিল তার প্রধান পরিচয়।
তিনি জানান, জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন নিয়েই দীর্ঘদিন এগিয়েছেন। তবে সময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করেন, সব স্বপ্ন বাস্তব হয় না। সেই অপূর্ণতাকে শক্তিতে পরিণত করেন তিনি।
জাতীয় দলে খেলতে না পারার আক্ষেপ আছে। তবে আমি নিজেকে বলেছি—যদি এখানে সফল না হই, অন্য জায়গায় এমন কিছু করব, যাতে নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে পারি, বলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেটে তিনি ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ নির্বাচিত হন এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ক্রিকেট থেকে বিসিএস
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে পড়াশোনার চেয়ে ক্রিকেটই তাকে বেশি টানত। ঢাকায় ক্লাব ক্রিকেট খেলতে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব হতো না। ফলে একাডেমিক ফলাফল আশানুরূপ হয়নি—যা নিয়ে তার কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শুধু ডিগ্রি দেয়নি; দিয়েছে নেতৃত্ব, বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা এবং মানুষ চেনার অভিজ্ঞতা।
নেতৃত্বের শিক্ষা ক্রিকেট মাঠ থেকেই
ক্রিকেট তার কাছে শুধু খেলা নয়, নেতৃত্ব শেখার ক্ষেত্রও। অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি শিখেছেন, একজন ভালো নেতা নির্দেশ দেন না—অনুপ্রাণিত করেন।
আমি সব সময় লিডারের চেয়ে লিডারশিপকে বেশি গুরুত্ব দিই। কাউকে জোর করে কাজ করানো নয়, বরং এমনভাবে বোঝানো, যাতে সে নিজেই কাজটি করতে আগ্রহী হয়—এটাই প্রকৃত নেতৃত্ব, বলেন তিনি।
ব্যর্থতা থেকে প্রত্যাবর্তন
৪৬তম বিসিএসে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না পেয়ে কিছু সময়ের জন্য হতাশ হন আমিন। তবে সেই ব্যর্থতাকে তিনি নতুন করে শুরু করার প্রেরণা হিসেবে নেন।
একটা ব্যর্থতা জীবনের শেষ নয়। একটা দরজা বন্ধ হলে আরেকটা দরজা খুলবেই,এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি আবার প্রস্তুতি শুরু করেন।
শৃঙ্খলাই সবচেয়ে বড় শক্তি
বিসিএস প্রস্তুতির পুরো সময় তিনি শৃঙ্খলাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। নিয়মিত জীবনযাপন, সময় ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা—এই তিনটি বিষয় তার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
কেন পুলিশ ক্যাডার পছন্দ ছিল?
আমিন খানের প্রথম পছন্দ ছিল পুলিশ ক্যাডার। মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ, নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্র এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখার সুযোগই তাকে এই ক্যাডারের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
জীবনদর্শন ও তরুণদের জন্য বার্তা
আমিন খানের মতে, সফলতা শুধু একটি চাকরি নয়, একজন ভালো মানুষ হওয়াই প্রকৃত সফলতা।
তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করবে না। প্রতিদিন নিজের উন্নতির জন্য কাজ করো। ধৈর্য ধরো, পরিশ্রম করো—সফলতা আসবেই।
একটি অপূর্ণ স্বপ্ন, একটি নতুন পরিচয়
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে না জড়াতে পারার আক্ষেপ থাকলেও সেই অপূর্ণতাকে শক্তিতে রূপ দিয়েছেন আমিন খান। একজন ক্রিকেটারের অসমাপ্ত স্বপ্ন থেকে একজন ভবিষ্যৎ পুলিশ কর্মকর্তার যাত্রা তাই শুধু পেশা বদলের গল্প নয়—এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণার গল্প।








আপনার মতামত লিখুন