নির্বাচনী ইশতেহার
মুসলিম পার্সোনাল ল’ প্রণয়ন ও হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চের অঙ্গীকার জামায়াতের
আইন ও বিচারব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি বিশেষভাবে ধর্মভিত্তিক পার্সোনাল ল’ সংরক্ষণ ও সংস্কারকে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছে।
দলটির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, মুসলিমদের জন্য ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক স্বতন্ত্র ‘মুসলিম পার্সোনাল ল’ প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পার্সোনাল ল–সংক্রান্ত একটি বিশেষ বেঞ্চ স্থাপনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেন। এ সময় দলের নায়েবে আমির মাওলানা আ.ন.ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য এবং ‘চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে ইশতেহারটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে আইন, বিচার ও স্বরাষ্ট্রসহ মোট ২৬টি খাতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইন ও বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি
১. বিচার প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন ও মামলার জট নিরসনে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
২. বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে।
৩. বিদ্যমান প্রসিকিউশন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দক্ষ করার লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন প্রসিকিউশন সার্ভিস গঠন করা হবে।
৪. নিবর্তনমূলক ও মানবাধিকার পরিপন্থী আইন সংস্কার করা হবে। গণগ্রেপ্তার, রিমান্ডে নির্যাতন, গুম এবং ‘আয়নাঘরের’ মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৫. মুসলিমদের জন্য ইসলামী শরীয়াহর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ স্বতন্ত্র ‘মুসলিম পার্সোনাল ল’ প্রণয়ন এবং হাইকোর্ট বিভাগে এ সংক্রান্ত বিশেষ বেঞ্চ স্থাপন করা হবে।
৬. নারীরা যাতে উত্তরাধিকার সম্পত্তি যথাযথভাবে বুঝে পান, তা নিশ্চিত করা হবে।
৭. পারিবারিক আদালত আইন ও বিধিমালার আধুনিকায়নে ‘পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩’ এবং ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫’ সংস্কার করা হবে। আপসমূলক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শিক্ষক, পেশাজীবী ও আলেমদের সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল বা কমিশন গঠন করা হবে।
৮. বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষায়িত আদালত স্থাপন এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন করা হবে।
৯. গ্রাম আদালত ও আইনগত সহায়তা ব্যবস্থা পুনর্গঠনে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সময়োপযোগী করে সংস্কার করা হবে।
১০. সাক্ষ্য আইন আধুনিকায়নে ‘সাক্ষ্য আইন ২০২৪’-এর খসড়াকে আরও যুগোপযোগী করা হবে।
১১. ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধিসহ অন্যান্য পুরোনো আইন সংস্কার করা হবে।
১২. ওয়াকফ ও যাকাত সংক্রান্ত আইনসমূহ (যেমন: ওয়াকফ অধ্যাদেশ ১৯৬২, যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩) যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে আরও কার্যকর করা হবে।
১৩. দীর্ঘসূত্রিতা পরিহারের জন্য মামলার প্রকৃতি অনুযায়ী বিচারের সর্বোচ্চ সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে।
১৪. ইসলামী অর্থনীতি, বীমা (তাকাফুল) ও ব্যাংকিং খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন ও সংস্কার করা হবে। ১৫. থানা পর্যায়ে সরকারিভাবে ‘লিগ্যাল এইড সেল’ গঠন করে গরিব ও অসচ্ছলদের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।
১৬. গত ১৫ বছরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদঘাটনে জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তায় একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ এবং টাস্ক ফোর্স গঠন করা হবে।
স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা খাতের উন্নয়নে গুরুত্বারোপ
১. স্বচ্ছ নিয়োগ ও আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি জনবান্ধব ও দক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হবে।
২. পুলিশ সদস্যদের বেতন, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাহিনীকে সম্পূর্ণ দুর্নীতি ও ঘুষমুক্ত করা হবে।
৩. কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
৪. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ট্রেনিং ম্যানুয়েলে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক অনুশাসন অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
৫. পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসারের মধ্যে সমন্বয় ও তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
৬. আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে শক্তিশালী করে প্রান্তিক অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর করা হবে।
৭. সন্ত্রাস ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হবে।
৮. নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে আলাদা ট্রাইব্যুনাল, হেল্পলাইন ও ভিকটিম সাপোর্ট সেল জোরদার করা হবে।
৯. বড় শহরগুলোতে স্মার্ট সিসিটিভি, ফেস রিকগনিশন ও রোবটিক নজরদারির মাধ্যমে স্মার্ট সিটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
১০. কারাগার সংস্কার করে বন্দিদের পুনর্বাসন ও কারারক্ষীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
১১. ১৮৬১ সালের ঔপনিবেশিক পুলিশ আইন পরিবর্তন করে ‘পুলিশ রিফর্ম কমিশন (২০২৪-২০২৫)’-এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে।
১২. পুলিশের কার্যক্রমে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত রাখা নিশ্চিত করা হবে।
১৩. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান বন্ধ করা হবে।
১৪. নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলার মাধ্যমে হয়রানি ও এ সংক্রান্ত দুর্নীতি বন্ধ করা হবে।
১৫. পুলিশি হেফাজতে থাকা বন্দিদের অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোকে ম্যাজিস্ট্রেটের নজরদারিতে আনা হবে।
১৬. ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ অ্যাপের মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে অপরাধের তথ্য জানানোর সুযোগ থাকবে।
ইশতেহারে ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে ৫টি ‘হ্যাঁ’ (সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান) এবং ৫টি ‘না’ (দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি) উল্লেখ করা হয়েছে। ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নারী ও যুবকদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের প্রচার বিভাগ জানায়, দেশ-বিদেশের ২৫০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ এবং ‘জনতার ইশতেহার’ ওয়েবসাইটে আসা প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদরা উপস্থিত ছিলেন।








আপনার মতামত লিখুন