জুলাই-আগস্ট এবং গণঅভ্যুত্থান: একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা
ভূমিকা- ২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রক্তাক্ত, বেদনাবিধুর ও গৌরবময় এক অধ্যায়। ছাত্র-আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে আমি ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান ভাইয়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সরাসরি রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার।
১০ জুলাই
পল্টন মোড়ে আন্দোলনের সূচনা
আমার শুরুটা হয়েছিল ১০ জুলাই, পল্টন মোড়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমি আমার কয়েকজন ছোট ভাইকে নিয়ে পূর্বঘোষিত ব্লকেড কর্মসূচিতে যোগ দিই।

দুপুর ১২টায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা একত্রিত হয়ে পুরো পল্টন মোড় অবরোধ করে ফেলি। ধীরে ধীরে সবাই বসে পড়ি। কোটার ন্যায্য সংস্কারের দাবিতে পল্টনের চার রাস্তার মোড়ে শুরু হয় এক অন্যরকম সৃষ্টিশীল প্রতিবাদ। কারও মুখে দৃপ্ত স্লোগান, কারও কণ্ঠে প্রতিবাদী সুর, আবার কেউ আগুনঝরা কবিতায় জ্বালিয়ে তোলে চারপাশের পরিবেশ।
সেই সময় আমার হাতে ছিল একটি প্ল্যাকার্ড। সেখানে লেখা ছিল—
“একেতো কোটার বাঁশ, তার ওপর প্রশ্ন ফাঁস!”
১১ জুলাই
শাহবাগে ব্যারিকেড ভেঙে অগ্রযাত্রা
বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের হুঁশিয়ারি ও কঠোর অবস্থান উপেক্ষা করে শত শত শিক্ষার্থী শাহবাগ মোড়ে সমবেত হয়ে অবরোধ গড়ে তোলে।

আমরাও পূর্বপরিকল্পিত কৌশল অনুযায়ী ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শাহবাগমুখী হই, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একত্রিত হওয়া সহজ হয়।
আমি আমার কয়েকজন অনুসারীকে নিয়ে শাহবাগে পৌঁছাই। ইতোমধ্যে মোড়জুড়ে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শাহবাগ।
আমরা দ্রুত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই।
পুলিশ আমাদের শাহবাগ মোড় অতিক্রম করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে যেতে দিতে চাইছিল না। তারা শাহবাগ মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে আমাদের আটকে দেয়।
সেই মুহূর্তে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা শাহবাগ মোড় পার হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে অবস্থান নেয়।
আমাদের কয়েকজন দায়িত্বশীল ছাত্রদল নেতা আশপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং আমাদের অবস্থান সুসংগঠিত রাখার চেষ্টা করি।
শাহবাগের সেই বিকেলটি ছিল আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সেখানে ভয়কে জয় করে, সংগঠনের দায়িত্ববোধ ও রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা ছাত্র-জনতার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিলাম।
১৫ জুলাই
রক্তাক্ত ক্যাম্পাস
দেশের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত দিন ছিল ১৫ জুলাই।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের পরিকল্পিত ও অমানবিক হামলার ঘটনা ঘটে। শতাধিক শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হন—কেউ রডের আঘাতে, কেউ বাঁশের আঘাতে, আবার কাউকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গণপিটুনির শিকার করা হয়।

সেদিন আমি সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল এলাকায় অবস্থান করছিলাম। শহীদুল্লাহ হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং আশপাশের ক্যাম্পাস এলাকায় ছাত্রদের সঙ্গে সংহতি জানাতে, তাদের পাশে থাকতে আমি ও আমার সহযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলাম।
সেদিন অনেক আহত শিক্ষার্থীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম।
ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের যৌথভাবে চালানো সেই বর্বর হামলা আমাদের সবাইকে হতবাক করে দেয়।
মুখোশধারীদের আগ্রাসনের মুখে আমরা বেশিক্ষণ টিকতে পারিনি। তবে যতক্ষণ পেরেছি, প্রতিরোধ করেছি, শিক্ষার্থীদের রক্ষা করেছি এবং তাদের পাশে থেকেছি।
এই হামলার ঘটনায় দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে রক্তাক্ত ছবিগুলো।
আমার দৃষ্টিতে, আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায় সেদিন থেকেই। ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ হারায়, প্রশাসন বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা পায় দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন।
আমি সেই দিনের প্রত্যক্ষদর্শী, অংশগ্রহণকারী এবং প্রতিরোধের একজন ক্ষুদ্র সৈনিক ছিলাম।
সেদিনের রক্ত, কান্না আর প্রতিজ্ঞা পুরো জুলাইজুড়ে আমার বুকের ভেতর আগুন হয়ে জ্বলেছিল।
১৬ জুলাই
সায়েন্স ল্যাবরেটরি: সংঘর্ষের দিন
বিকেল ৩টা।
উত্তপ্ত জুলাইয়ের সেই বিকেলে ঢাকা কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে গিয়ে অবস্থান নিই। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয় আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষার্থী।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা আন্দোলনের সামনের সারিতে অবস্থান নিই, যাতে বিপরীত দিক থেকে আসা গুলি, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটের প্রথম আঘাত আমাদের ওপরই আসে।
স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থাকায় আমরা অনেকটাই এসব পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করেই সামনের সারিতে অবস্থান নিয়েছিলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে…
১৮ জুলাই
‘কমপ্লিট শাটডাউন’: রাজপথে উত্তাল এক দিন
১৮ জুলাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সাহসী দিন—‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির দিন। আমার স্মৃতিতে, ওই দিনের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, আর আমি ছিলাম সেই আন্দোলনের সরাসরি অংশীদার।
সকাল ৯টায় কাকরাইল মোড় থেকে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃত্বে দিনের প্রথম বড় মিছিল শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা সকাল ৯টার আগেই কাকরাইল মোড়ে পৌঁছে যাই। নির্ধারিত সময়ে মিছিল শুরু হলে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষের কণ্ঠে প্রতিফলিত হচ্ছিল ক্ষোভ, আশা এবং দৃঢ় প্রত্যয়।
প্রথম কর্মসূচি শেষ করে আমি পুরানা পল্টনের দিকে যাই।
দুপুর ১২টায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ফকিরাপুল মোড় থেকে দ্বিতীয় মিছিলের পরিকল্পনা করা হয়। আমিও প্রস্তুত অবস্থায় সেখানে উপস্থিত হয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করি।
কিন্তু মিছিল শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সামনের দিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসে। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে আমি প্রাণ বাঁচাতে ফকিরাপুল বাজার এলাকার একটি ভবনে আশ্রয় নিই।
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ভবন থেকে বের হয়ে শান্তিনগর মোড়ে যাই। সেখানে তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে অবস্থান করছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই ছাত্রদলের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী সেখানে একত্রিত হন। আমি এবং আমার সহযোদ্ধারাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনের সারিতে যুক্ত হই।
সেই সময় আমি কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলি। তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি যে আমরা সামনে থাকব, যাতে ঝুঁকির প্রথম আঘাত আমাদের ওপর আসে এবং তারা তুলনামূলক নিরাপদে থাকতে পারে।
সারাদিন বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের কারণে পুরো এলাকা অস্থির হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনায় আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই এবং নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হই।
সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আজও আমার স্মৃতিতে স্পষ্ট। ভয়, সাহস, অনিশ্চয়তা এবং সহযোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্ববোধ—সবকিছু মিলিয়ে দিনটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম কঠিন অভিজ্ঞতা।
১৯ জুলাই
রক্তাক্ত শুক্রবার
১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপির সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়।

জুমার আগেই আমি পল্টনে পৌঁছে যাই। বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রেসক্লাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় হাইকোর্ট এলাকার কাছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের মধ্যে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ি এবং বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই।
সেই সময় পুরানা পল্টন এলাকায় অবস্থানকালে আশপাশে একাধিক রাজনৈতিক কর্মসূচি চলছিল। চারদিকে ছিল চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। বিভিন্ন গলিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আমার চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়েন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতা নবীন তাকুলদার। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরতে দেখে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। আমরা কয়েকজন মিলে তাকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু সেই দৃশ্য আমাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠায় আমরা নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ের দিকে সরে যাই। কিন্তু সেখানেও দীর্ঘ সময় অবস্থান করা সম্ভব হয়নি। সারাদিন বিভিন্ন এলাকায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, গুলিবর্ষণ এবং চরম আতঙ্কের মধ্যেই সময় কেটে যায়।
সন্ধ্যার দিকে আবারও এক সংঘর্ষের সময় আমি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাই। পরে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে বুঝতে পারি, আমার বাম কানের পাতায় একটি গুলির ছররা আটকে আছে। এছাড়া বাম হাত, নাভির পাশ এবং পায়ের রানে ছররার আঘাত লেগেছিল।
পরবর্তীতে একটি হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা নিয়ে শরীরের ক্ষতস্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা করাই এবং নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাই।
সেই রাত থেকেই কারফিউ শুরু হয়। আহত অবস্থায় ২০ জুলাই থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত আমাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়।
৩০ জুলাই
লালের প্রতিবাদ
১৯ জুলাই রাতে কারফিউ জারির পর আহত অবস্থায় কয়েকদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ না হলেও আন্দোলনের প্রতি দায়বদ্ধতা আমাকে ঘরে বসে থাকতে দেয়নি।
৩০ জুলাই তৎকালীন সরকার একতরফাভাবে দিনটিকে ‘রাষ্ট্রীয় শোক দিবস’ ঘোষণা করে। কিন্তু দেশের গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতা এই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে প্রতীকী প্রতিবাদের কর্মসূচি গ্রহণ করে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে চোখ ও মুখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়।
আমিও সেই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি। সেদিন একটি লাল টি-শার্ট পরে চোখ ও মুখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে আমার ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করি।
সেদিন ফেসবুকজুড়ে যেন লালের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। হাজারো মানুষ একই প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছিল।
৩ আগস্ট
‘এক দফা’—ইতিহাস বদলে যাওয়ার দিন
৩ আগস্ট আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন।
দুপুর তিনটার দিকে আমি এবং আমার সঙ্গে থাকা ছাত্রদলের কয়েকজন ছোট ভাই শহীদ মিনারের উদ্দেশে রওনা দিই। আমাদের হৃদয়ে তখন একটাই প্রত্যয়—এই দুঃশাসনের অবসান চাই।

শহীদ মিনারের মূল ফটকের সামনে পৌঁছে আমরা অবস্থান নিই। আমি একটি রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে শুরু করি। মুহূর্তেই চারপাশের জনতা সাড়া দেয়। চারদিকে ছিল মানুষের ঢল, পতাকার মিছিল, প্রতিবাদের ভাষা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
সেই আবেগঘন মুহূর্তে পূর্বঘোষিত নয় দফার পরিবর্তে চারদিক থেকে উচ্চারিত হতে থাকে একটাই দাবি—
“এক দফা।”
সরকারের পদত্যাগের দাবিতে সেই স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শহীদ মিনার এলাকা। আমার কাছে মনে হয়েছিল, সেদিন শহীদ মিনার শুধু একটি সমাবেশস্থল ছিল না; বরং একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনাস্থলে পরিণত হয়েছিল।
সেখান থেকেই পরদিন ৪ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সমাবেশ শেষে আমরা মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে যাই। সেখানে আমি একটি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়াই।

প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—
“দিনে নাটক, রাতে আটক।”
রাত আটটা পর্যন্ত আমি শাহবাগ মোড়ে অবস্থান করি।
৪ আগস্ট
অসহযোগ আন্দোলনের রক্তাক্ত দিন
৪ আগস্ট সকাল ১১টার আগেই আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী শাহবাগ মোড়ে পৌঁছে যাই। লক্ষ্য ছিল অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচিকে সফল করা।
কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আমার দেখা অনুযায়ী, পিজি হাসপাতাল এলাকায় অবস্থানরত সরকার-সমর্থক ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, আগুন এবং গুলির শব্দে মুহূর্তেই পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
প্রথম ধাক্কা সামলে আন্দোলনকারীরা পুনরায় সংগঠিত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শাহবাগ মোড় আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
দুপুরের দিকে আমরা শেরাটন মোড়ের দিকে অগ্রসর হই। সেখানে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়। গুলিবর্ষণ ও পাল্টাপাল্টি প্রতিরোধের মধ্যে বহু মানুষ আহত হন। পরে আরও অনেক আন্দোলনকারী সেখানে এসে যোগ দিলে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে এবং আন্দোলনকারীরা সামনে এগিয়ে যান।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে সংঘর্ষের কেন্দ্র ধীরে ধীরে কারওয়ান বাজার ও পরে ফার্মগেট এলাকার দিকে সরে যায়।
ফার্মগেটের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আমার জীবনের অন্যতম বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই।
আমার স্মৃতিতে, রাস্তার দুই পাশের উঁচু ভবন ও আশপাশের বিভিন্ন অবস্থান থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হচ্ছিল। একের পর এক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। অনেকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।
সেই মুহূর্তে আমরা আর অবস্থান ধরে রাখতে পারিনি।
আমি গুরুতর আহত এক সহযোদ্ধাকে নিয়ে দ্রুত শাহবাগ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে রওনা দিই। কিন্তু হাসপাতাল এলাকায়ও তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে তাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে পারিনি।
পরিস্থিতির চাপে শেষ পর্যন্ত তাকে হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে রেখে আমাকে সরে আসতে হয়।
আজও সেই মুহূর্তটি মনে পড়লে গভীর অপরাধবোধে ভুগি। একজন আহত সহযোদ্ধার পাশে শেষ পর্যন্ত থাকতে না পারার কষ্ট আমাকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়।
পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে মৎস্য ভবন মোড় পেরিয়ে পল্টনের একটি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিই।
কিন্তু রাত সাড়ে নয়টার দিকে পুরোনো পল্টনের বিভিন্ন ভবনে তল্লাশির খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকেও বের হয়ে যেতে বাধ্য হই।
কিছু সময় একটি গলিতে একা বসে ছিলাম। চারদিকে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর ক্লান্তি।
হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত আর কোথাও না গিয়ে সেদিন রাতেই নিজের বাসায় ফিরে যাই।
৫ আগস্ট
বিজয়ের সকাল
সারারাত মিলিয়ে বড়জোর দুই ঘণ্টার মতো ঘুম হয়েছিল। সকালে ঠিক আটটার দিকে ঘুম ভাঙে।
চোখ খুলেই দেখি, আম্মা আমার ঘরে বসে আছেন। আমি দ্রুত প্রস্তুতি নিচ্ছি দেখে তিনি বুঝে ফেললেন—আজও আমি আন্দোলনের উদ্দেশ্যে বের হব।

তিনি খুব বেশি কিছু বলেননি। শুধু শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন,
“পরিস্থিতিটা বুঝে রওনা দিস।”
মায়ের সেই কথার উত্তর না দিয়েই আমি বের হয়ে পড়ি। গন্তব্য—শহীদ মিনার।
রাস্তা তখন প্রায় জনশূন্য। কিছু দূর হেঁটে যাওয়ার পর একটি লেগুনা গুলিস্তানের দিকে যেতে দেখলাম। পুরো গাড়ি প্রায় খালি ছিল। তবুও ভেতরে বসার ইচ্ছা হলো না। পেছনে দাঁড়িয়ে পুরো পথের পরিস্থিতি দেখতে দেখতে গুলিস্তানের দিকে রওনা দিলাম।
গুলিস্তানে নেমে শহীদ আহাদ পুলিশ বক্স অতিক্রম করে নগর ভবনের দিকে হাঁটতে শুরু করি। চারপাশে থমথমে পরিবেশ। রাস্তায় মানুষ খুবই কম। পুলিশ তরুণদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল, অনেককেই আটক করছিল।
নগর ভবনের দিকে যেতে যেতে এক রিকশাচালককে দ্রুত ফিরে আসতে দেখি। তার রিকশায় রক্তের দাগ ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?”
তিনি উত্তরে বললেন,
“মামা, শহীদ মিনারের দিকে পুলিশ নির্বিচারে গুলি করছে। ওইদিকে যাইয়েন না।”
তার কথা শুনে আমি পথ পরিবর্তন করি। কিছুক্ষণ পর মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের সামনে এসে দাঁড়াই। সেখান থেকে দেখি জিরো পয়েন্ট হয়ে পুলিশের কয়েকটি গাড়ি বঙ্গভবনের দিকে যাচ্ছে।
গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পর পায়ে হেঁটে পল্টন মোড়ে যাই। পরিচিত একটি অফিসে কিছুক্ষণ অবস্থান করি। কিছু সময় পর সেলিম ভাই সেখানে আসেন।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আমরা দুজন রমনা পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রওনা দিই।
শিশু পার্কের গেটের কাছে পৌঁছে দেখি শাহবাগ মোড়ে পুলিশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করছে। আমরা দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকি।
অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের আশপাশে আরও কিছু মানুষ জড়ো হন। আমরা একসঙ্গে শাহবাগের দিকে এগিয়ে যাই।
শাহবাগে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনী পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরিস্থিতি ছিল টানটান উত্তেজনাপূর্ণ।
ঠিক সেই সময় খবরটি ছড়িয়ে পড়ে—
শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।
খবরটি শোনার পর আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি।
সেনাবাহিনীর একটি সাঁজোয়া যানের পাশে বসে পড়ি।
মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে আগের দিনের সব দৃশ্য—কারওয়ান বাজারে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকা সহযোদ্ধারা, ঢাকা মেডিকেলের সামনে রেখে আসা আহত ভাইটি, রক্তাক্ত মুখগুলো, আর অসংখ্য অজানা মানুষের কান্না।
নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে যায়।
আমি মাটিতে বসেই মাকে ফোন করি। তার কণ্ঠ শুনে বুকের ভেতরের চাপ কিছুটা হালকা হয়।
আমার বিশ্বাস ছিল, দীর্ঘ আন্দোলন, অসংখ্য ত্যাগ এবং রক্তের বিনিময়ে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
উপসংহার
জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে আবেগঘন এবং সবচেয়ে স্মরণীয় সময়।
এই স্মৃতিচারণ কেবল রাজপথে কাটানো কয়েকটি দিনের বিবরণ নয়; এটি আমার দেখা, আমার অনুভব করা এবং আমার বিশ্বাস অনুযায়ী ইতিহাসের এক অস্থির সময়ের ব্যক্তিগত সাক্ষ্য।
আমি দেখেছি মানুষের সাহস।
আমি দেখেছি ভয়।
আমি দেখেছি রক্ত, কান্না, ত্যাগ এবং আশার এক অসাধারণ মিশ্রণ।
এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের চরম সত্য হয়ে থাকবে।
এটা শুধু একটি প্রতিবাদের গল্প নয়; আমার কাছে এটি ছিল একটি স্বপ্নের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাস।
কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—
যেখানে ছাত্র-জনতা এক হয়, সেখানেই জন্ম নেয় নতুন সূর্য।
লেখক- মোঃ জিয়াউর রহমান খন্দকার, যুগ্ম-আহ্বায়ক ঢাকা কলেজ ছাত্রদল








আপনার মতামত লিখুন