এলডিসি-উত্তর বাংলাদেশের পথচলা

ছবি- সংগৃহীত।
স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকায় ছিল। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এই তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে , কিন্তু সরকার ২০২৯ সাল পর্যন্ত সেটা বজায় রাখতে জাতিসংঘকে নোটিশ দিয়েছে। জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় দেশ হিসেবে এই মর্যাদা ছাড়বে বাংলাদেশ। এটি নিঃসন্দেহে গর্বের একটি মুহূর্ত। কিন্তু এই গর্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা: এলডিসি থাকাকালীন যে সুযোগ-সুবিধাগুলো অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছিল, সেগুলো একে একে সরে যাবে, আর তার জায়গা পূরণ করতে হবে নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে।
যে চ্যালেঞ্জগুলো সামনে অপেক্ষা করছে :
১. বাণিজ্য সুবিধা হারানো:
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮০-৮৪ শতাংশ। এই খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের “এভরিথিং বাট আর্মস”-এর মতো শুল্কমুক্ত-কোটামুক্ত সুবিধার ওপর। উত্তরণের পর এই সুবিধা ধাপে ধাপে উঠে গেলে রপ্তানি আয়ে ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত ধস নামতে পারে, যা বছরে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের সমান।
২. ঋণের খরচ বৃদ্ধি :
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ যেসব সহজ শর্তে উন্নয়ন-অর্থায়ন পেয়ে এসেছে, উত্তরণের পর তা আর মিলবে না। ইতিমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে এসেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক শর্তে ঋণ নেওয়ার চাপ অর্থনীতির জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা :
বন্দর, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শুল্ক প্রক্রিয়া এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অদক্ষতা রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে। জাতীয় পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সাম্প্রতিক প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের আস্থায়ও চিড় ধরাতে পারে।
৪. রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা :
২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকার উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে, যা এখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিবেচনাধীন। স্থগিতাদেশ মিলুক বা না মিলুক কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো সমাধান না হলে সমস্যা থেকেই যাবে, কেবল সময় পিছিয়ে যাবে।
৫. সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি :
“উন্নয়নশীল দেশ” তকমা সরে গেলে বহু অনানুষ্ঠানিক সহায়তা কর্মসূচির যৌক্তিকতাও হারিয়ে যাবে। অথচ দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির জন্য এখনো নেই টেকসই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
ভবিষ্যতে করণীয়
রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ জরুরি ভিত্তিতে। শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর না করে চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবার মতো খাতে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকা নির্ভরতা কমিয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হবে।
জিএসপি প্লাসের জন্য দর কষাকষি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে শ্রম ও পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদগুলো প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়ন করতে হবে কাগজে-কলমে নয়, কারখানার মেঝেতে।
রাজস্ব খাতে সংস্কার। করজাল সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি রোধে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে, যাতে ব্যয়বহুল বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। বন্দর ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, শুল্ক প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং পরিসংখ্যান ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, অপরিহার্য।
সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা। বেকারত্ব ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা ও লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মতো টেকসই কর্মসূচি চালু করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদেরও সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে, যাতে উত্তরণ সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।
দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা। সরকার, ব্যবসায়ী মহল ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বিত একটি “স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি” বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিটি ধাপে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও দায়বদ্ধতা থাকে।
শেষ কথা
এলডিসি থেকে উত্তরণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় — এটি বহু বছরের অগ্রগতির স্বীকৃতি। কিন্তু এই স্বীকৃতি ধরে রাখা এবং তার সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এই দুটোই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশের সামনে বিকল্প নেই হয় সময়মতো প্রস্তুতি নিয়ে এই উত্তরণকে টেকসই প্রবৃদ্ধির সোপান বানাতে হবে, নয়তো প্রস্তুতিহীন অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হবে। খড়কুটোর ভেলায় নয়, শক্ত জাহাজেই পাড়ি দিতে হবে এই নতুন যাত্রা।
লেখক : রাকিবুল হাসান,
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।







আপনার মতামত লিখুন