চবিতে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, দুদকের অভিযান
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে অভিযান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দুদক চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক সায়েদ আলমের নেতৃত্বে এ অভিযান শুরু হয়।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন উপ-সহকারী পরিচালক হামেদ রেজা, উপ-সহকারী পরিচালক সবুজ হেসেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ফেরানোর লক্ষ্যে নতুন নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগের নতুন নীতিমালা অনুমোদনের পরপরই কার্যকর করা হয়। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, একজন শিক্ষক প্রার্থীকে ক্রমান্বয়ে তিনটি ধাপে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। প্রথমত লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে প্রার্থীর প্রেসেন্টেশন নিবে নিয়োগ বোর্ড। প্রেজেন্টেশনে উত্তীর্ণ প্রার্থীকে ভাইবা বোর্ডে বসতে হবে। এই তিন ধাপের পরীক্ষায় সর্বাধিক নাম্বার পেয়ে যেই প্রার্থী উত্তীর্ণ হবেন তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, এই নীতিমালার আওতায় বর্তমান প্রশাসনের সময়ে এ পর্যন্ত মোট ৭৮ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ৫৬৫তম সিন্ডিকেটে বিভিন্ন বিভাগে ১৮ জন এবং তার আগের ৫৬৪তম সিন্ডিকেটে ৩৮ জন শিক্ষক নিয়োগ পান। অর্থাৎ দুই সিন্ডিকেট মিলিয়ে ৫৬ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
সর্বশেষ ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় ফাইন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীম। এর আগে গত বছরের ১৯ আগস্ট ফাইন্যান্স বিভাগে চারটি প্রভাষক পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে প্রভাষক পদে চারজন শিক্ষক নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে ১৯ ডিসেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয় এবং উপাচার্যের কার্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বলেও উল্লেখ ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ফাইন্যান্স বিভাগের চারটি প্রভাষক পদের বিপরীতে শিক্ষক হিসেবে আবেদন করেন মোট ৫১ জন প্রার্থী। এই চার পদের মধ্যে একটি সহকারী অধ্যাপক পদের বিপরীতে এবং আরেকটি সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। সর্বমোট ৪ পদের মধ্যে দুটি স্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ এবং দুটি অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
রেজিস্টার দপ্তর থেকে প্রকাশিত আবেদনকারীদের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীমের নাম তালিকাভুক্ত ছিল ৪৩ নম্বরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী ফাইন্যান্স বিভাগে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। আবেদনকারী ৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে এতে উত্তীর্ণ হন মাত্র ৮ জন প্রার্থী। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা পরবর্তী ধাপে নিয়োগ বোর্ডের সামনে প্রেজেন্টেশন দেন এবং এরপর অনুষ্ঠিত হয় মৌখিক পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন ও ভাইবা এই তিন ধাপের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত চারজন প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। এই চারজনের মধ্য থেকেই অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য মাহিরা শামীমকে সুপারিশ করে নিয়োগ বোর্ড।
বিভাগীয় একাডেমিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মাহিরা শামীম স্নাতক (অনার্স) পর্যায়ে সিজিপিএ ৩.৮০ অর্জন করেছেন। তবে মাহিরা শামীম শিক্ষক নীতিমালার অধীনে আয়োজিত তিন ধাপের পরীক্ষায় অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় সর্বাধিক নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে নিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।
অভিযান শেষে টিম লিডার দুদক-১ (চট্টগ্রাম) এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম গণমাধ্যম কর্মীদেরকে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আমরা নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এই বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। সংবাদপত্রে যে বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে যে সর্বশেষ সিন্ডিকেটে ১৫০ জন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, এমন কোন আলামত আমরা পাইনি। এটা মিথ্যা অভিযোগ। বরং অধিকাংশ অস্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করা হয়েছে। সর্বশেষ সিন্ডিকেটে ১৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি, বরং ১৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে ছাত্রদলের নিন্দা ও প্রতিবাদ
গত দেড় বছরে ব্যাপক নিয়োগ নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটির দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন সমাজ ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের চেতনাকে উপেক্ষা করে বর্তমান প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ছাত্রদলের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত চাহিদা না থাকলেও গত ১৫ মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ২৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আরও ৩০৪টি পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে চালু রাখা হয়েছে। এতে মোট ৫৫৪ জনের নিয়োগ কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
নিয়োগে অনিয়মের সবচেয়ে আলোচিত দৃষ্টান্ত হিসেবে ছাত্রদল উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহীরা শামীমের ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের প্রসঙ্গ তোলে। সংগঠনটির ভাষ্য, ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিলেও তা অমান্য করে ১৯ ডিসেম্বর ওই নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়।
ছাত্রদলের অভিযোগে বলা হয়, ফিন্যান্স বিভাগের চারটি প্রভাষক পদের বিপরীতে ৫১ জন আবেদন করলেও বহু যোগ্য প্রার্থীকে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ডাকযোগে পরীক্ষার তারিখ জানানোয় অনেক আবেদনকারী সময়মতো অবগত হতে পারেননি। মাত্র ৫০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়, যার প্রশ্ন নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরাই তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুত করেন। পরীক্ষা শেষের দিনই ফল প্রকাশ করা হলেও কেবল নির্বাচিতদের নাম জানানো হয়; প্রাপ্ত নম্বর প্রকাশ করা হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভাগের মেধাতালিকায় দ্বাদশ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও উপ-উপাচার্যের কন্যাকে একাদশজন যোগ্য প্রার্থীকে টপকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অন্যান্য বিভাগেও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ছাত্রদল জানায়, ফিন্যান্স বিভাগের এক শিক্ষকের সন্তানের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগে নিয়োগ, বাংলা বিভাগে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও একাধিক পদের বিজ্ঞপ্তি এবং ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে পরিকল্পনা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশ হলেও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে দাবি করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল চার দফা দাবি উত্থাপন করেছে। দাবিগুলো হলো— স্পষ্ট অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদত্যাগ, উপ-উপাচার্যের কন্যাসহ সব বিতর্কিত ও অবৈধ নিয়োগ বাতিল, ইউজিসির নির্দেশ অমান্য করে নিয়োগ বোর্ড পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি,
বিভাগীয় আপত্তি উপেক্ষা করে দেওয়া সব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, এসব দাবি মানা না হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।








আপনার মতামত লিখুন