চবির সিনেটে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি না থাকায় অধিবেশন প্রত্যাখ্যান চাকসুর

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৩৬তম সিনেট অধিবেশন প্রত্যাখ্যান করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)। সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধি নিশ্চিত না করেই অধিবেশন আয়োজনের অভিযোগ তুলে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বাজেট বরাদ্দসহ ১৯ দফা দাবি জানিয়েছে চাকসু।
শনিবার (৮ আগস্ট) অনুষ্ঠিতব্য ৩৬তম সিনেট অধিবেশনকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অধিবেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকানের কাছে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চাকসুর সহ-সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন রনি, সাধারণ সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব, যোগাযোগ ও আবাসন বিষয়ক সম্পাদক ইসহাক ভূইয়া, দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক হারেস মাতব্বর, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সোহান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক মাসুম বিল্লাহসহ চাকসুর অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
চাকসুর সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেটে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে পাঁচজন নির্বাচিত সদস্যের অংশগ্রহণের কথা থাকলেও সিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই মঞ্চে শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, বর্তমান সিনেট অধিবেশনে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ও ‘মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষক প্রতিনিধি’দের নিয়ে অধিবেশন আয়োজন করা হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ থাকা শিক্ষক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা শিক্ষকদের নিয়েও সমালোচনা করে চাকসু। এসব কারণ দেখিয়ে অধিবেশনটি প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয় সংগঠনটি।
চাকসুর ১৯ দফা দাবি
চাকসুর দাবির মধ্যে রয়েছে পরবর্তী চাকসু, হল সংসদ ও সিনেট নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং চাকসু ও হল সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় বার্ষিক পরিচালন বাজেট নিশ্চিত করা।
আবাসন সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আবাসিক হলের সংস্কার, মেরামত ও আধুনিকায়ন, আলাওল হল ও এ. এফ. রহমান হলের এক্সটেনশন ভবন নির্মাণ এবং আবাসন সক্ষমতা অন্তত ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে চাকসু। দীর্ঘমেয়াদি আবাসন সংকট সমাধানে বহুতল আবাসিক হল নির্মাণের জন্য পৃথক উন্নয়ন বাজেট এবং আবাসন সুবিধাবঞ্চিত অন্তত ৩ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন ভাতা চালুর দাবিও রয়েছে।
পরিবহন সংকট নিরসনে নতুন শাটল ট্রেন সংযোজন, বিদ্যমান ট্রেনে অতিরিক্ত বগি যুক্ত করা এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দের দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহরগামী অন্তত ১০টি বাস চালুর দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য টিএসসি ও মুক্তমঞ্চের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু, কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়াম নির্মাণ, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আধুনিক স্টেডিয়াম এবং কেন্দ্রীয় মসজিদ পুনর্নির্মাণের জন্য উন্নয়ন বাজেট অনুমোদনের দাবি করা হয়েছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে ক্লাসরুম আধুনিকায়ন, ডিজিটাল লাইব্রেরি সমৃদ্ধকরণ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও হলগুলোর রিডিং রুম সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
চাকসুর দাবির তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারকে অন্তত ৩০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন এবং নতুন অ্যাম্বুলেন্সের জন্য বাজেট বরাদ্দের বিষয়টিও রয়েছে।
এ ছাড়া ছাত্রীদের জন্য আধুনিক জিমনেসিয়াম, বিশেষায়িত টার্ফ নির্মাণ, ক্যাম্পাসের পুকুর সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং গবেষণাগার ও গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
অটোমেশন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে কার্যক্রম চালু করা, পুরো ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, স্বল্পমূল্যে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া অথবা বিকল্প ব্যবস্থা এবং হল ডাইনিংয়ে খাদ্য-ভর্তুকির দাবিও করেছে চাকসু।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো খেলোয়াড় আহত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট ও কাউন্সেলর সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ ‘মেন্টাল হেলথ কাউন্সিল/সেন্টার’ পরিচালনার জন্য বাজেট বরাদ্দের দাবিও রয়েছে।
চাকসুর নেতারা বলেন, এসব দাবি বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে উপাচার্যের প্রতি এসব বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে চাকসু একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ে সিনেট নির্বাচন আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।







আপনার মতামত লিখুন