জাকসুর মেয়াদেই অটোমেশন চালু, ৮.৫৬ কিমি সড়ক সংস্কারসহ একাধিক উদ্যোগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) বর্তমান কমিটির মেয়াদের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রত্যাশিত অটোমেশন ব্যবস্থা চালুর আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের ৮.৫৬ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ, গবেষণা ও থিসিসের বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু, চিকিৎসাসেবার অনিয়ম তদন্ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন এবং জাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টায় জাকসুর ১১তম নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি ও চলমান কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান জাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু। এর আগে জাকসুর ষষ্ঠ কার্যনির্বাহী সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জিতু বলেন, নির্বাচনের আগে শিক্ষার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও প্রশাসনের আলোচনার টেবিলে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু দাবি ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
জাকসুর মেয়াদেই অটোমেশন
বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোমেশন কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে জাকসু ভিপি জিতু বলেন, অটোমেশন বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক সভা করেছে। সেখানে জাকসুর তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং মূল্যায়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, “মাননীয় উপাচার্য মহোদয় কথা দিয়েছেন, জাকসুর মেয়াদের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রত্যাশিত অটোমেশন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হবে। ৫৫তম ব্যাচ থেকে ধাপে ধাপে সব ব্যাচকে অটোমেশনের আওতায় আনা হবে।”
একাডেমিক সংস্কার ও গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি
একাডেমিক সংস্কারের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের সাতটি দাবি একাডেমিক কাউন্সিলে নীতিগতভাবে অনুমোদন পেয়েছে বলে জানান জিতু। এসব দাবির কয়েকটি আগামী সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে গবেষণা ও থিসিসের বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর বিষয় রয়েছে।
গবেষণা ও থিসিসের বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে যেখানে ৭৫০ টাকা বরাদ্দ ছিল, তা বাড়িয়ে ৮ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ফাইন্যান্স কমিটির সভায় অনুমোদন হয়েছে।
জিতু বলেন, “৭৫০ টাকা থেকে প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি করে ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার টাকা করার জন্য এফসি মিটিংয়ে অনুমোদন হয়েছে। আগামী সিন্ডিকেটে আমরা এ বিষয়ে বড় ধরনের সুসংবাদ পাব বলে আশা করছি।”
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রমের বাজেটও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি। জিতুর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে এ খাতে ১৮ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের জন্য তা বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
২৫ কোটি টাকায় ৮.৫৬ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার
ক্যাম্পাসের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৮.৫৬ কিলোমিটার সড়ক নতুন করে নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে। একই সঙ্গে সড়কের পাশে ফুটপাত ও সাইকেল লেন নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
জাকসু ভিপি বলেন, “আগামী ৯ সেপ্টেম্বর মাননীয় উপাচার্য আনুষ্ঠানিকভাবে সড়কের কাজ উদ্বোধন করবেন।”
চিকিৎসাসেবায় অনিয়মের তদন্ত, ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবার বাজেট ব্যবহারে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন জিতু। তাঁর অভিযোগ, অতীতে চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ করা অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হতো না এবং সেখানে অনিয়মের সুযোগ ছিল।
এ বিষয়ে জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক হুসনে মোবারকসহ মেডিকেল সেন্টারের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা কাজ করেছেন বলে জানান তিনি। অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নতুন করে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান জিতু।
তিনি বলেন, “তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময় শেষ হয়েছে। আজকে আবার নতুন করে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। মাননীয় উপাচার্য স্যার খুব শিগগিরই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা বলেছেন। আগামী সিন্ডিকেটে যারা দোষী, তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি কথা দিয়েছেন।”
আমিনবাজারে নেওয়ার প্রস্তাব ক্যাম্পাসের বর্জ্য
ক্যাম্পাসের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাঙ্গামাটি এলাকার ডাম্পিং স্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমে পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি জাকসুর।
বিষয়টি সমাধানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং বর্জ্য আমিনবাজারের ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়ার বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানান জিতু।
তিনি বলেন, “ডাম্পিং স্টেশনটি নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বর্জ্যগুলো একসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই এটি বাস্তবায়নের মুখ দেখবে।”
বাস্তবায়নের পথে মাস্টারপ্ল্যান
বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান জাকসু ভিপি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাস্টারপ্ল্যানটি ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে ‘গ্রিন বুক’-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।
জিতু বলেন, “মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন স্থাপনা কোথায় হবে, সেটি পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা হবে।”
সংশোধন হচ্ছে জাকসুর গঠনতন্ত্র
জাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। জিতু বলেন, ৩৩ বছরের পুরোনো গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন জায়গায় বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, “৩৩ বছরের পুরোনো গঠনতন্ত্র দিয়ে নির্বাচন হয়েছে। আমাদের এক বছরের পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে যেখানে যেখানে পরিবর্তনের প্রয়োজন মনে হয়েছে, সেগুলো আমরা সংশোধনের প্রস্তাবে দিয়েছি।”
সপ্তম কার্যনির্বাহী সভায় গঠনতন্ত্র অনুমোদনের আগে জাকসুর ওয়েবসাইটে প্রস্তাবিত সংশোধনগুলো প্রকাশ করে দুই দিনের জন্য শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করা হবে বলেও জানান জিতু।
জাকসুর অর্থের অডিট হবে
জাকসুর আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তিন সদস্যের একটি অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে উপাচার্য মনোনীত একজন শিক্ষক, কোষাধ্যক্ষ মনোনীত একজন প্রতিনিধি এবং জাকসুর একজন প্রতিনিধি থাকবেন।
এ বিষয়ে জাকসু ভিপি বলেন, “এখন পর্যন্ত জাকসু কী কী কাজ করেছে, কোন খাত থেকে কত টাকা এসেছে এবং কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব অডিট করা হবে। জাকসুর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেই হিসাব শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে সবার সামনে উপস্থাপন করা হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে জাকসুর চলমান বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি আগামী ১১তম জাকসু নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ দ্রুত ঘোষণার দাবিতে উপাচার্য বরাবর ৪ দফা দাবি জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।








আপনার মতামত লিখুন