রাত ১২টা থেকে সকাল ৭টা—জুডিশিয়ারিতে ফাহিমের সাফল্যের প্রস্তুতি

ইকরামুল আলম ফাহিম। (ফাইল ছবি)
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ৩০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জজ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইকরামুল আলম ফাহিম। দ্বিতীয়বার প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিয়েই চূড়ান্তভাবে সফল হয়েছেন তিনি। নির্দিষ্ট লক্ষ্য, কৌশলগত প্রস্তুতি, নিয়মিত পড়াশোনা ও পরিবারের অনুপ্রেরণাকে নিজের সাফল্যের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন ফাহিম। ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করে তিনি খুবই উচ্ছ্বসিত।
নিজের ফলাফল প্রকাশের মুহূর্তের অনুভূতি জানিয়ে ফাহিম বলেন, “বিজেএসের রেজাল্ট যখন প্রকাশ হয়, তখন আমি জিইসি মোড়ে ছিলাম। রেজাল্ট দেখার আগে হাত-পা কাঁপছিল—কী হয় না হয়, সেটা নিয়ে একটা ভয় কাজ করছিল। কিন্তু রেজাল্ট দেখার পর দেখি আমি ৩০তম হয়েছি। তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি। এরপর বাবা-মাকে জানালে তারা খুশিতে কেঁদে ফেলেন। আমার এই সফলতার পেছনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।”
ফাহিম জানান, শুরুতে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। তবে নানা সমস্যার কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন। প্রথমবার প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না এলেও দ্বিতীয়বার প্রিলিমিনারি দিয়েই চূড়ান্তভাবে সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।
জুডিশিয়ারিতে আসার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে ফাহিম বলেন, “জুডিশিয়ারিতে আসার পেছনে আমার মূল অনুপ্রেরণা ছিল মা-বাবা। এরপর ডিপার্টমেন্টের সিনিয়ররা। বিশেষ করে রাজীব ভাইয়ের কথা বলতে হয়। তাঁর জন্যই জুডিশিয়ারিতে আসার ইচ্ছা তৈরি হয়।”
শৈশবের একটি অভিজ্ঞতাও তাকে এই পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান ফাহিম। তিনি বলেন, “আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের জুডিশিয়াল বিষয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল। তখন থেকেই একটা ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল যে আমি বড় হয়ে জজ হব। যেন আমাদের মতো অন্য কাউকে এমন জুডিশিয়াল ঝামেলায় পড়তে না হয়, সেই চেষ্টা করব।”
কৌশলগত প্রস্তুতিতে গুরুত্ব
বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে ফাহিম বলেন, “আমি দেখেছি, আমাদের সিনিয়রদের অনেকেই চার-পাঁচ-ছয়বার পরীক্ষা দিয়েছেন। এমনকি আটবার দিয়েও সফল হয়েছেন, এমনও আছেন। কিন্তু আমার পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে এত সময় দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। আমি চিন্তা করেছিলাম, একবারেই হলে হয়ে যাবে। এরপর যেন আর এফোর্ট দিতে না হয়। তাই সেভাবেই আগানোর চেষ্টা করেছি।”
প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বই পড়ার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ফাহিম বলেন, “কোনো একটি বই ভালো এবং সবাই সেটি পড়ছে—এমনটা শুনলে আমি বইটি কিনে ফেলতাম। বই কিনতে আমি কখনো কার্পণ্য করিনি। অনেক বই পড়ার চেষ্টা করেছি। তবে শুধু বেশি সময় পড়লেই জুডিশিয়ারিতে সফল হওয়া যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।”
নিজের পড়াশোনার সময়সূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমার টিউশন থাকত প্রতিদিন দুই-তিনটি। তাই খুব বেশি সময় পড়ার সুযোগ পেতাম না। আমার মনে পড়ে না যে আমি কখনো চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি পড়তে পেরেছি। তবে আমার একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। সারাদিন যা-ই করি না কেন, রাত ১২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সময়টা শুধু পড়াশোনার জন্য রাখতাম। দিনে ঘুমাতাম, রাতে পড়তাম।”
লিখিত পরীক্ষায় ভিন্ন কৌশল
লিখিত পরীক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি মনে করেন ফাহিম। তিনি বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, লিখিত পরীক্ষাটাই মূল। তাই উত্তরপত্র কীভাবে সুন্দরভাবে ও গুছিয়ে লেখা যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিয়েছি। সবাই সাধারণত গতানুগতিকভাবে প্যারাগ্রাফ লেখে। আমি সেটি এড়িয়ে যত কম লিখে বেশি তথ্য দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি পয়েন্ট করে লিখতাম। প্রয়োজন অনুযায়ী তীর চিহ্ন ব্যবহার করতাম। বাড়তি কথা লেখার চেষ্টা করতাম না। যতটা সম্ভব সরাসরি লেখার চেষ্টা করেছি। পয়েন্ট আকারে লিখলে লেখাগুলোও গুছানো মনে হয়।”
ভাইবায় আত্মবিশ্বাসই ছিল মূল শক্তি
ভাইবা বোর্ডের অভিজ্ঞতা জানিয়ে ফাহিম বলেন, “রিটেন পরীক্ষার পর ভাইবা হতে এবার অনেক সময় লেগেছে—প্রায় চার থেকে সাড়ে চার মাসের মতো। আমার ভাইবা শেষের দিকে হওয়ায় প্রস্তুতির জন্য অনেক সময় পেয়েছিলাম। তাই নার্ভাসনেস খুব বেশি ছিল না।”
তিনি বলেন, “ভাইবা বোর্ডে ঢোকার পর যখন দেখলাম একটি প্রশ্নের উত্তর পারছি, তখন আর নার্ভাসনেস তেমন কাজ করেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকরাম স্যার ছিলেন। তিনি কিছু প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে করার চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি কত নম্বর পেতে পারি বা পাব—এ ধরনের প্রশ্নও করেছিলেন। আমি যখন সেগুলোর উত্তর দিই, স্যাররা হাসছিলেন। এতে ভাইবা বোর্ডের পরিবেশটাও কিছুটা বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।”
“আমি বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছিলাম। এ কারণে খুব বেশি সমস্যা হয়নি। আর আমার একটা আত্মবিশ্বাস ছিল যে রিটেনে যত নম্বর প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি নম্বর থাকবে বলে আমার মনে হয়েছিল। তাই ভাইবা বোর্ডও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শেষ করতে পেরেছি,” যোগ করেন তিনি।
ফল প্রকাশের অপেক্ষায় অনিশ্চয়তা
রিটেন পরীক্ষার ফল প্রকাশে দীর্ঘ সময় লাগায় মানসিক চাপের মধ্যেও ছিলেন ফাহিম। তিনি বলেন, “এই পুরো সময়ের একটা পর্যায়ে আমি একদম হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ ফল প্রকাশে অনেক সময় লাগছিল। যদিও পরীক্ষা দেওয়ার পর আমি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বাসায় এসে মিলিয়ে দেখি এবং আনুমানিক সর্বনিম্ন কত নম্বর পেতে পারি, সেটা হিসাব করার চেষ্টা করি। এ কারণে প্রথমদিকে কিছুটা স্বস্তিতে ছিলাম।”
তিনি আরও বলেন, “কিন্তু সময় যত যাচ্ছিল, ততই ভয় লাগছিল যে ফল আসবে কি না। অনেকেই চার-পাঁচবার পরীক্ষা দিচ্ছেন, অনেকের ফল আসছে না। আমার কী হবে, সেটাও চিন্তা হচ্ছিল। বিভিন্ন গ্রুপে সবাই পোস্ট করে জানতে চাইছিলাম কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। ফলে আমরা যারা রিটেন পরীক্ষা দিয়েছিলাম, সবাই একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম।”
টিউশনের অভিজ্ঞতাও দিয়েছে বাড়তি সুবিধা
দীর্ঘদিনের টিউশনের অভিজ্ঞতাকেও নিজের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ফাহিম। তিনি বলেন, “আমি কখনো কোনো চাকরিতে যোগ দিইনি। এর একটাই উদ্দেশ্য ছিল—আমার লক্ষ্য ছিল জুডিশিয়ারি। আমি সবসময় টিউশন করাতাম।”
“আমার বয়স যখন ১৫ বছর, তখন থেকে এখন পর্যন্ত কখনো টিউশন ছাড়িনি। এমনকি ভর্তি পরীক্ষার সময়ও টিউশন ছাড়িনি, জুডিশিয়ারির প্রস্তুতির সময়ও ছাড়িনি। এটা হয়তো আমাকে কিছুটা এগিয়ে রেখেছে। কারণ সাধারণ বিষয়গুলোর সঙ্গে আমার নিয়মিত চর্চা ছিল। আর চাকরিতে যোগ না দেওয়ার একটি কারণ ছিল—আমার লক্ষ্য শুরু থেকেই জুডিশিয়ারি,” বলেন তিনি।
ফাহিমের মতে, সফলতার জন্য দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করার চেয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, কৌশলগত প্রস্তুতি, নিয়মিত চর্চা এবং নিজের সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।








আপনার মতামত লিখুন