প্রমির সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প

বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর। নারী ও পুরুষকে এভাবেই দেখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বর্তমানে নারীরা কোনো কাজেই পিছিয়ে নেই। তারা নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ঘরে বাইরে সব পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। অনলাইন ব্যবসায়ের প্রবর্তনের ফলে নারীরা আরও বেশি সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হচ্ছে।
বলছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিনা ইয়াসমিন প্রমির কথা।

ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি আর রংতুলির সঙ্গে তার ছিল গভীর বন্ধুত্ব। সময় পেলেই রংতুলি হাতে বসে যেত সে। ফ্যাশন ও পোশাকের নকশার প্রতি বরাবরই তার আকর্ষণ ছিল। ছোটবেলা থেকেই প্রমি ক্রাফটিং করতেন—কাগজ, কাপড়, ক্লে কিংবা হাতের কাছে থাকা বিভিন্ন ফেলনা উপকরণ দিয়ে তিনি বানাতেন নানারকম সৃষ্টিশীল জিনিস। সেগুলো প্রমি উপহার দিতেন পছন্দের মানুষদের। ইউটিউব দেখে দেখে তিনি শিখেছিলেন অনেক কিছু।
চারুকলায় পড়ার সুবাদে রঙের ভিন্ন ভিন্ন উপাদান সম্পর্কে তার গভীর ধারণা তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই কাজের প্রতি আরও আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা জন্মে। এসব কাজের বিনিময়ে যে কোনোদিন টাকা নেবেন—এমন ভাবনা কখনোই তার মনে আসেনি।
নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রমি। প্রথমে উদ্যোক্তা হওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না তার। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও চারুকলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরই তিনি নিজে উদ্যোক্তা হওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবীরা কেউ পোশাক, কেউ ড্রাই ফুডস, কেউ হ্যান্ড-পেইন্টেড ড্রেস, কেউ কসমেটিকস—এভাবে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন, তা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। তাঁদের পথ অনুসরণ করে তিনিও লেখাপড়ার পাশাপাশি অনলাইনে পোশাক ব্যবসা শুরু করেন।

তিনি ভাবতেন একদিন নিজের একটি গল্প হবে, যে গল্পের প্রতিটা শব্দ হবে একজন সফল মানুষের। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর শিক্ষা অর্জন শেষে তাইতো নিজের একটা গল্প তৈরিতে উদ্যোগী হন তানজিনা ইয়াসমিন প্রমি।
যাত্রা শুরুর গল্প বলতে গিয়ে প্রমি বলেন, ‘শূন্য থেকেই শুরু করেছি। প্রথমে ব্যবসা করাটা মোটেও সহজ ছিল না। আমি ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হই। একদিকে পুঁজি নেই, তার ওপর পরিবারের অমতে এই বিভাগে ভর্তি হয়েছি। তখনই মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলাম—এখন থেকে আমার পড়াশোনার খরচ আর পরিবার থেকে নেবো না।’
‘শুরুর দিকে কোনো টিউশনও পাচ্ছিলাম না। হাতে জমানো কিছু টাকা ছিল, যা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে এক মাস চলে যায়। একটা আয়ের উৎস খুব প্রয়োজন ছিল। সেখান থেকেই ব্যবসার আইডিয়াটা মাথায় আসে।’
তিনি বলেন ‘প্রথমে আমার মাথায় যে আইডিয়াটা আসে সেটা হলো মাটির জিনিসপত্র বানানো। চারুকলায় জুয়েলারি বানানোর জন্য উপযোগী মাটি ছিল। সেখান থেকেই প্রথমে মাটির তৈরি গহনা বানিয়ে নিজের আইডিতে পোস্ট দিতাম। এগুলো দেখে আমার এক বান্ধবী পহেলা বৈশাখের জন্য একটি গয়না কাস্টমাইজ অর্ডার দেয়।’
‘আমি তখন জানতাম না যে সেগুলো কাঠের গয়না। আমার আরেক বন্ধুবি আমাকে পরামর্শ দেয়—চট্টগ্রামে একটি পাইকারি বাজার আছে, যেখানে কাঠের ম্যাটেরিয়ালস পাওয়া যায়, যেগুলো দিয়ে জুয়েলারি বানানো হয়। আমি সেই দোকানে গিয়ে ৫৭০ টাকার কাঠের ম্যাটেরিয়ালস কিনি। এটিই ছিল আমার প্রথম বিনিয়োগ—সেখান থেকেই শুরু ব্যবসার পথচলা।’
‘দ্বিতীয়বার আমি এক বন্ধুর কাছ থেকে ১৬০০ টাকা ধার নিয়ে আবার ইনভেস্ট করি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। লাভের অংশ দিয়েই আমি পরবর্তী উপকরণগুলো কিনতাম।
এভাবে করতে করতে আজ আমার মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ২০–৩০ হাজার টাকায়। তবে কখনো কখনো তা কমবেশি হয়। যেসব মাসে অনুষ্ঠান বা প্রোগ্রাম বেশি থাকে, সে মাসে বিক্রিও বেশি হয়।’
প্রমি বলেন ‘আমি যখন এই ব্যবসাটা শুরু করি, তখন কাঠের জুয়েলারি বানাতো এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম ছিল। চারুকলায় এক-দু’জন এ ধরনের কাজ করতেন। পরে দেখি, আমার কয়েকজন সিনিয়র একই জিনিস নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। তখন আমি আমার ব্যবসার আইডিয়াটা পরিবর্তন করি। আমার সবসময় ইউনিক কিছু করতে ভালো লাগে। সেই সময় আমি কৃত্রিম ফুল দিয়ে গায়ে হলুদের গয়না বানানো শুরু করি।’
তিনি বলেন, ‘এরমধ্যেই করোনার কারণে হঠাৎ সব থমকে গেল। ম্যাটেরিয়ালস কিনতে বাইরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। পেজটা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সে সময় বাসায় আগেই কেনা কিছু কুশি সুতা ছিল। ইউটিউব দেখে দেখে সেই বন্দী সময়টাকে কাজে লাগিয়ে কুশি কাজ শেখা শুরু করি। বাচ্চাদের কুশি জুতা, জামার গলা, কুশি লেস, কুশি জুয়েলারি—এভাবে অনেক কিছু বানিয়েছি। এটাও আমার ব্যবসার একটি শক্তিশালী অংশ হয়ে গেল।’
প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে প্রমি জানান ‘একজন নারী উদ্যোক্তার লড়াইয়ের গল্প পুরোটা বলা যায় না। কারণ শুধু লড়াইয়ের মুহূর্তগুলোতেই অনুভব করা যায় সেই চাপ ও অনুভূতিগুলো। একদিন আমার পেজটা হ্যাক হয়ে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। নতুন পেজ খোলার কথা ভাবছিলাম এমন সময় পুরনো পেজটা ফেরত পেলাম। সেখান থেকেই আবার শুরু করি। তবে হ্যাক হওয়ায় রিচ কমে গিয়েছিল, কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। নিজের আইডিতেই ব্যবসা–সংশ্লিষ্ট সব কিছু পোস্ট করতাম। শুরুতে পরিচিত মানুষজনই আমার কাছ থেকে জিনিস কিনতেন। বড় কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হইনি। ছোটখাটো যে সমস্যাগুলো ছিল, সময় ও ধৈর্য দিয়ে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।’
তিনি বলেন ‘মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামে আমি স্টল দিই। এরপর ব্লক ও বাটিক করার কথা ভাবলাম। যেই ভাবা, সেই কাজ—ইউটিউব দেখে এটাও শিখে ফেললাম। এসব কাজ আমি শিখেছি নিজের আগ্রহ থেকে, ভালো লাগা থেকে। কিন্তু আমার কাজ দেখে অনেকেই আমার কাছ থেকে প্রোডাক্ট কিনতে চাইতে লাগল। সেভাবেই এগুলোও আমার ব্যবসার প্রোডাক্টে পরিণত হলো।’
‘এসব ছাড়াও বর্তমানে আমি হুপ আর্ট, ক্যানভাস পেইন্টিং, লিপ্পান আর্ট, ওয়াল পেইন্টিং, হ্যান্ড পেইন্ট শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি–পিস, ব্লক প্রিন্ট,শাড়ি,পাঞ্জাবি, থ্রি–পিস, কাপল সেট—এসব নিয়েও কাজ করছি।’
উদ্যোক্তা জীবনের যাত্রাপথের একটি নিজস্ব ছন্দ থাকে। সেই ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের পথ এগিয়ে নেওয়াটাই জীবন। অনেক ঝড়–ঝাপটা পেরিয়ে উদ্যোক্তা জীবন কেমন লাগছে জানতে চাইলে প্রমি বলেন, ‘কেমন লাগছে সেটা এক বাক্যে বলা কঠিন। মিশ্র একটা অনুভূতি। নিজের কাজ সম্পর্কে ভালো কোনো কথা শুনলে খুব ভালো লাগে। কখনো কখনো কাজের চাপে হাঁপিয়ে উঠি, হতাশা আসে। আবার হঠাৎ কোনো ভালো খবর শুনে উৎফুল্ল হয়ে উঠি। এই তো—এভাবেই কেটে যাচ্ছে উদ্যোক্তা জীবনের দিনগুলো।’
তিনি বলেন ‘উদ্যোক্তা জীবন মানেই ভালো–মন্দের সঙ্গে মানিয়ে সামনে এগিয়ে চলা। সমাজে টিকে থাকতে হলে একজন নারী উদ্যোক্তাকে সামাজিকভাবে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সময়ে–অসময়ে অনলাইনেও বিভ্রান্তিকর ও বিড়ম্বনামূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার জীবন মোটেও সুখকর হয় না; প্রতিনিয়ত লড়াই করে ব্যবসাকে ধরে রাখতে হয়।’
সবশেষে নিজের উদ্যোগের বিষয়ে প্রমি বলেন, ‘সমাজের অনেক নারীই উদ্যোক্তা হতে চান, কিন্তু উদ্যোগ থাকলেও সুযোগ পান না। আমি সেই উদ্যোগগুলোকে সামনে আনতে চাই। আমার স্বপ্ন হলো নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা—যারা সফল হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন। পাশাপাশি নিজেও হতে চাই একজন সফল উদ্যোক্তা। বর্তমানে বেকারত্ব বেড়েই চলছে, তবুও আমি কিছুটা সফল হয়েছি। আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনেক নারীর আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে—এটাই আমার কাছে বড় প্রাপ্তি।’
উদ্যোক্তা তৈরির স্বপ্ন দেখা এই নারী আরও বলেন, ‘একজন নারী উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি অন্য নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর পরিসরে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছি। অনেক নারী আছেন যারা কোনো একটি পণ্য খুব ভালোভাবে তৈরি করতে পারেন, এবং তা নিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নও দেখেন। এমন ছোট–ছোট উদ্যোগকে সমর্থন ও সহযোগিতা করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’







আপনার মতামত লিখুন