প্রফেসর ড. মুহাম্মদ শামসুদ্দীন
শিক্ষা, গবেষণা ও গণতান্ত্রিক চেতনায় এক নিবেদিতপ্রাণ বুদ্ধিজীবী

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ শামসুদ্দীন দেশের শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। শিক্ষকতা, গবেষণা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
১৯৫২ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের দক্ষিণ বাকলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রামের সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি এবং ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৭৪ সালে বি.এ. (সম্মান) এবং ১৯৭৫ সালে এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৭৬ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষকতা জীবনে তিনি একজন জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ১৯৭৭ সালে কানাডার ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে সফলতার সঙ্গে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৯৪ সালে ফ্রান্স সরকারের স্কলারশিপ লাভ করে প্যারিস ন্যান্টেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬২ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৪ সালে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনী প্রচারণা, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, স্যার এফ.আর. হলের প্রভোস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, সিনেট ও সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ১৯৭৩ বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষক সমাজের ন্যায্য দাবি আদায়ে তিনি সবসময় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণায় তাঁর রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দে চট্টগ্রাম, কানাডিয়ান রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতি এবং ফ্রান্স রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সদস্য ছিলেন।
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ শামসুদ্দীনের রচিত দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় তাঁর অসংখ্য কলাম ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংক্রান্ত সাব-কমিটি–১ এর সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আমন্ত্রণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চার কন্যা সন্তানের জনক। তাঁর বড় মেয়ে গাইনেকোলজি বিষয়ে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে গাইনি বিভাগে কর্মরত আছেন। মেজ মেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্য বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থাপত্যবিদ হিসেবে কর্মরত। সেজ মেয়ে একজন দন্তচিকিৎসক এবং বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাস করছেন। আর ছোট মেয়ে ফ্রান্সের প্যারিস-স্যাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত আছেন।
শিক্ষা, গবেষণা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি গভীর প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ শামসুদ্দীন দেশের শিক্ষা অঙ্গনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন।
লেখক : ইরফানুল হক
গবেষক-লা রোশেল ইউনিভার্সিটি, ফ্রান্স।







আপনার মতামত লিখুন