নিকাব ইস্যুতে জবিতে আলোচনা: ‘পরিচয় নিশ্চিত করাই উদ্দেশ্য’, বলছেন হল প্রভোস্ট

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে নিকাব পরা এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে হল প্রভোস্টের কথোপকথনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষার্থী নিজেকে অপমানিত ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার অভিযোগ তুললেও, হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আন্জুমান আরা দাবি করেছেন, তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের স্বার্থে শিক্ষার্থীর পরিচয় নিশ্চিত করা।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থী প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ১৯তম ব্যাচের টি. ডব্লিউ. শাওরীন। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় একটি কাজে হল প্রভোস্টের কার্যালয়ে গেলে তিনি নিকাব পরিহিত ছিলেন। এ সময় তার পোশাক নিয়ে করা কিছু মন্তব্যে তিনি মানসিকভাবে কষ্ট পান।

শিক্ষার্থীর দাবি, প্রশাসনিক কারণে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়োজন থাকলে তা শালীনভাবে জানানো যেত। তবে ইসলামে পর্দার বিধান নিয়ে মন্তব্য করায় তিনি বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত পোশাক ও স্বাধীন পছন্দের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।
তবে অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আন্জুমান আরা বলেন, “আমি কোনো শিক্ষার্থীকে অপমান করার উদ্দেশ্যে কিছু করিনি। আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা এবং পরিচয় নিশ্চিত করা। বাইরে কেউ মুখ ঢেকে চলাফেরা করবেন কি না, সেটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু প্রশাসনিক প্রয়োজনে, বিশেষ করে আমার কক্ষে কোনো শিক্ষার্থী এলে তাকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি কাউকেই ইচ্ছাকৃতভাবে ফিরিয়ে দিই না। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রয়োজনে আসে। অনেকেই নিয়মিত আসেন, তাদের মুখ দেখেই চিনতে পারি। কিন্তু পরিচয় নিশ্চিত না করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সেই দায়িত্ব থেকেই আমি প্রয়োজনীয় বিষয়টি বলেছিলাম।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, এ কারণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মানসিক কষ্ট পেয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে, এমনকি ‘পাগল’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। অথচ আমি দীর্ঘদিন ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমার হলে কোনো ধরনের অনিয়ম, চাঁদাবাজি বা অসদাচরণ প্রশ্রয় পায়নি। কারণ নীতির প্রশ্নে আমি কখনো আপস করিনি।”
নিজের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার দায়িত্বের মেয়াদ আর মাত্র তিন মাস। শারীরিক অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও আমি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। ব্যক্তিগত কোনো লাভের জন্য নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করছি। আমি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিইনি এবং ভবিষ্যতেও দেব না।”
শিক্ষার্থীদের প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতোই দেখি। এই ঘটনার পর আমি উপলব্ধি করেছি, একটি ভুল বোঝাবুঝি কত বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তাই আমি চাই, সবাই পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে দেখুক। আমার কোনো বক্তব্য বা পদক্ষেপ যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকে, সেটি কখনোই ইচ্ছাকৃত ছিল না। আমি সব সময় নিয়ম, দায়িত্ব ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েই কাজ করেছি এবং দায়িত্বের শেষ দিন পর্যন্ত সেটিই করে যেতে চাই।”
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একাংশ শিক্ষার্থী ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রশাসনিক প্রয়োজনে পরিচয় নিশ্চিত করাকে যৌক্তিক বলে মত দিয়েছেন অনেকেই। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।








আপনার মতামত লিখুন