‘উপরের নির্দেশ’ নয়, নতুন প্রজন্ম চায় আইনের শাসন
মুসাদ্দেক আল আকিব। ছবি- সংগৃহীত।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিষয় বারবার আলোচনায় আসছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা আইন ও সংবিধানের প্রতি অনুগত, আর কতটা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নির্দেশনির্ভর। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে জনগণের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়ে তৎকালীন সরকারের আমলে পুলিশ প্রশাসনের একটি অংশের মধ্যে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে আইনের চেয়ে ‘উপরের নির্দেশ’ অধিক কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকার পরিবর্তনের পরও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে।
সম্প্রতি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর নেতৃবৃন্দের গাড়িবহর আটকে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে, নাকি পুরোনো নির্দেশনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কৃতিই নতুন বাস্তবতায় ফিরে আসছে?
নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিল, যেখানে প্রশাসনের পরিচয় হবে নিরপেক্ষতা, পুলিশের পরিচয় হবে পেশাদারিত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সংবিধান ও আইনের আলোকে। কোনো ব্যক্তি, দল বা ক্ষমতাকেন্দ্রের ইচ্ছা নয়-আইনই হবে সর্বোচ্চ।
পুলিশ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের দায়িত্ব সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়; বরং রাষ্ট্র, সংবিধান এবং জনগণের প্রতি। আইন যদি একদিকে থাকে আর কোনো নির্দেশ যদি অন্যদিকে থাকে, তবে একটি পেশাদার বাহিনীর জন্য আইনের পক্ষেই অবস্থান নেওয়াই হওয়া উচিত।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে রাষ্ট্রে আইনের পরিবর্তে নির্দেশনির্ভর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে জনগণের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থাই সংকটে পড়ে। অন্যদিকে, যে রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হয় এবং গণতন্ত্র সুসংহত হয়।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং সেই ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ। কারণ ব্যক্তি ও সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের নীতি ও আইনের শাসন যদি পরিবর্তিত না হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কখনোই বাস্তবে রূপ নেবে না।
গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সেই চেতনার প্রতি সম্মান জানাতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, বরং আইনের অনুগত।
রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব শক্তির প্রদর্শনে হয় না, এটি হয় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়। ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করে যদি আমরা আইনকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তবেই একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
মুসাদ্দেক আল আকিব
লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী







আপনার মতামত লিখুন