ঢাকার জলাভূমি রক্ষায় সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ

ঢাকার জলাভূমি রক্ষায় সমন্বিত ও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ বা বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সুপারিশ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের পিএইচডি গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক মো. আশ্রাফ উদ্দিন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিভাগের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত তাঁর দ্বিতীয় উন্মুক্ত সেমিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনের সময় এ সুপারিশ করা হয়।
‘Wetland Dynamics and Management: A Case of Dhaka City’ শীর্ষক গবেষণাটি বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণায় ঢাকার জলাভূমির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, এর কারণ, ভবিষ্যৎ প্রবণতা ও ব্যবস্থাপনা চর্চা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় ১৯৮৮, ১৯৯৫, ২০০৫, ২০১৬ ও ২০২৪ সালের ল্যান্ডস্যাট ও সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে নদী, খাল, লেক, পুকুর, মার্শ ও অ-জলাভূমি এলাকার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সাক্ষাৎকার, কী ইনফরম্যান্ট ইন্টারভিউ, ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও জিআইএসভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ১৯৮৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার জলাভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ সময়ে জলাভূমিবহির্ভূত ভূমি প্রায় ৮৩ বর্গকিলোমিটার বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মার্শ বা নিম্নভূমি জলাভূমি। এটি ১০১ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ২২ দশমিক ৯ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়, খালগুলো মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে অনেক খালের প্রস্থ, গভীরতা, পানিপ্রবাহ ও পরিবেশগত কার্যকারিতা কমেছে। পুকুর ও লেকের ক্ষেত্রে ভরাট, দখল, বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদীর ক্ষেত্রে তীর দখল, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য, পলি জমা এবং পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
গবেষণায় জলাভূমি হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে ভূমি ভরাট, দখল, বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভূমির রেকর্ড ও সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব এবং জনসচেতনতার ঘাটতিকেও দায়ী করা হয়েছে। মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অবশিষ্ট জলাভূমি আরও সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
জলাভূমি সংরক্ষণে গবেষক নদী, খাল, পুকুর, লেক ও মার্শের সীমানা স্থায়ীভাবে নির্ধারণ, নিয়মিত খনন ও পুনঃখনন, বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, জিআইএসভিত্তিক হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং দখলমুক্ত জমি পুনরায় দখল রোধের সুপারিশ করেন। পাশাপাশি নগর পরিকল্পনায় জলাধার ও রিটেনশন এরিয়া সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সেমিনারে বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আলামিন হক, অধ্যাপক ড. হাসিনা আখতার, সহযোগী অধ্যাপক ড. শবনম সারমিন লুনা, ড. মো. মহিউদ্দিন, ড. রিফাত মাহমুদ, সহযোগী অধ্যাপক ড. রেফাত নাসের, নাহরীন জান্নাত হোসেন ও খন্দকার তানভীর হোসেনসহ শিক্ষক ও গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা গবেষণার পদ্ধতি, ফলাফল ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করেন এবং গবেষণার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
বক্তারা বলেন, দ্রুত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, তাপদাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে ঢাকার জলাভূমি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।








আপনার মতামত লিখুন