রিল-নির্ভর সমাজ : সাফল্যের শর্টকাট মানসিকতা ও সাংস্কৃতিক দূষণের বাস্তবতা
ফেসবুকের কন্টেন্ট মনিটাইজেশন—শব্দটা শুনলেই যেন চোখে ভেসে ওঠে একদল তরুণের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, হাতে সেলফি স্টিক, পিছনে ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘ট্রেন্ডিং’ সাউন্ড, আর চোখেমুখে “ডলার আসতেছে ভাই!” এক ধরনের রহস্যময় জ্যোতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয়ের নতুন সম্ভাবনা অবশ্যই প্রশংসনীয়, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, যেখানে কর্মসংস্থানের পথ অনেক সময় ইচ্ছেমতো মেলে না। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে—এই সুযোগটা যতটা ব্যবহার করার কথা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি অপব্যবহার করার এক ধরনের সমবেত উৎসব চলছে। ফলে কন্টেন্ট মনিটাইজেশন স্বপ্ন দেখাচ্ছে যতটা, তার চেয়ে বেশি দুঃস্বপ্ন তৈরি করছে বললে খুব ভুল হবে না। আর এই দুঃস্বপ্নটা মূলত সমাজের ভেতরে ধীরে ধীরে জমে ওঠা এক ধরনের সাংস্কৃতিক দূষণও বটে।
এখন দেখা যাচ্ছে, কেউ ভাত খাচ্ছে—রিল। কেউ বাসায় দাওয়াত গেছে—রিল। কেউ ছাদে উঠে দাঁতের ব্যথা দেখাচ্ছে, চুল শুকাচ্ছে—রিল। এমনকি কারও বাড়ির সামনে কুকুর ঘেউঘেউ করলেও সেটারও রিল বানিয়ে ভাইরাল হওয়ার চেষ্টা। কারণ ভাইরাল হলেই ভিউ বাড়বে, ভিউ বাড়লেই ডলার আসবে—এই সহজ সমীকরণ এখন আমাদের সমাজের এক বড় অংশকে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ উপাধিতে ভূষিত করেছে।
অথচ তাদের বেশিরভাগেরই কন্টেন্টের সঙ্গে সৃজনশীলতার ১% সম্পর্কও নেই। মাঝেমধ্যেই মনে হয়, দেশব্যাপী যেন এক ধরনের “রিল বানানোর মহড়া” চলছে—যেখানে কে কী করছে সেটাই মুখ্য নয়; ডলার আসবে কি আসবে না—সেটাই মূল প্রতিযোগিতা। সামাজিক আচরণবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “মনোযোগ-অর্থনীতি” (attention economy) যেভাবে মানুষের আবেগ এবং আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন ঠিক সেই চক্রের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
এখানে অবশ্যই বলা দরকার, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন—বিশেষ করে জ্ঞানভিত্তিক, শিক্ষামূলক বা সৃজনশীল কন্টেন্টের মনিটাইজেশন—একজন তরুণকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারে, দেশকে ডিজিটাল জ্ঞানভান্ডারে সমৃদ্ধ করতে পারে। আমাদের দেশের অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী আছেন, যাঁরা সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক মানের কন্টেন্ট তৈরি করছেন এবং দেশের নামও উজ্জ্বল করছেন। সমস্যা তাঁদের নয়—সমস্যা সেই ‘সবকিছুর রিল-যোগ্যতা আছে’ এমন মানসিকতার মানুষদের, যারা শুধু ক্লিক এবং ভিউয়ের আশায় সামাজিক মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নানান সংবেদনশীল ইস্যুকে অবহেলা করে এক ধরনের ‘ডিজিটাল কোলাহল’ (digital chaos) তৈরি করেছেন।
আর এই কোলাহল থেকে বেরিয়ে আসছে এক অদ্ভুত সামাজিক প্রভাব। যেমন ধরুন, অনেকে মনে করছেন—ডাক্তার হতে এমবিবিএস লাগে, ইঞ্জিনিয়ার হতে চার বছরের ডিগ্রি লাগে, কিন্তু কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হতে লাগে শুধু একটি স্মার্টফোন। তাই পড়াশোনা বাদ দিয়ে, দক্ষতা অর্জন বাদ দিয়ে অনেকেই ভেবে বসছে—এইতো সহজ পথ, হয়ে গেলাম ‘সেলিব্রিটি’। ফলে সামাজিকভাবে এক ধরনের ‘সাফল্যের শর্টকাট’ সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মকে আরও অসহিষ্ণু, অধৈর্য এবং রেগেমেগে ওঠার মতো করে তুলছে। কারণ ভাইরাল রিল বানানো এত সহজ নয়; ভিউ না এলে মনোবেদনা জন্মায়, মানসিক চাপ বাড়ে, আবার অনেকেই ভিউ বাড়ানোর জন্য অদ্ভুত, ঝুঁকিপূর্ণ বা বিতর্কিত কন্টেন্ট তৈরি করতে গিয়ে বিপদে পড়ে। সমাজের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।
এছাড়াও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এখন অনেকটা জাতীয় সম্পদের মতো ‘শেয়ারযোগ্য’। কেউ অসুস্থ—ভিডিও। কেউ কাঁদছে—ভিডিও। কেউ সমস্যায় পড়েছে—ভিডিও। যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন রিলের কাঁচামাল। এতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, পরিবারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। ফেসবুক ভিডিওর মনিটাইজেশন নীতির ভিতরে ‘সেন্সেশনাল কন্টেন্ট’ বরদাশত না করার কথা বলা আছে, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের দৃশ্যপট কিছুটা অন্যরকম। প্রায়শই দেখা যাচ্ছে, অযথা বিতর্ক তৈরি করা, উস্কানিমূলক মন্তব্য করা বা অন্যকে অপমান করা—এসবই বেশি মনোযোগ পাচ্ছে। কারণ মনোযোগ মানেই ভিউ, ভিউ মানেই টাকা। এমন চাহিদা তৈরি হলে সমাজ স্বভাবতই নৈতিকতার মানদণ্ডে নিচের দিকে নামতে শুরু করে।
এখানে আরেকটি বড় সমস্যা হলো—অন্যান্য মিডিয়ার ভূমিকা। যখন দেখানো শুরু হলো, ‘চরফ্যাশনের মমতাজ বেগম রিল বানিয়ে লাখ টাকা আয় করছে’, তখন সেটি আরও অনেককে উৎসাহিত করলো। কিন্তু দেখানো হলো না যে এর পেছনে কত দক্ষতা লাগে, কত নিয়ম মানতে হয়, কত বিরতি সহ্য করতে হয়, কত সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে সঠিক কন্টেন্ট তৈরি করতে হয়। ফলে মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে গেল, বাস্তবতা হলো উল্টো। বেশিরভাগ মানুষ কয়েক মাস রিল বানায়, ভিউ আসে না, মনিটাইজেশনও আসে না—তারপর হতাশা, মানসিক চাপ, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া—এসব নানা সমস্যা তৈরি হয়। তবে সব দোষ শুধু জনগণের নয়। প্ল্যাটফর্মের নজরদারি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল, মিথ্যা তথ্য, ভুয়া খবর, বিভ্রান্তি ছড়ানো ভিডিও—অনেক সময় এগুলোও ভিউ পেয়ে যায়। মানুষ বুঝতেই পারে না কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল। ফলে ‘তথ্য দূষণ’ এমনভাবে ছড়াচ্ছে যে সমাজের ভেতর বিভ্রান্তি, ভুল ধারণা এবং নানা ধরনের গুজব বেড়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কন্টেন্ট মনিটাইজেশন বন্ধ করার প্রশ্ন নয়—বরং এটিকে সুশৃঙ্খল করা জরুরি। প্রথমত, কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের উপর জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি, তথ্য যাচাই, কপিরাইট, গোপনীয়তা—এসব বিষয়ে নিয়মিত আলোচনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভুল বা ক্ষতিকর কন্টেন্ট শেয়ারের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, অ্যালগোরিদমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
একই সঙ্গে এটাও ভুলে গেলে চলবে না—কন্টেন্ট মনিটাইজেশন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে এটি হতে পারে অসাধারণ সুযোগ। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন, সংস্কৃতি—এসব ক্ষেত্রে তথ্যবহুল এবং গঠনমূলক কন্টেন্ট তৈরি হলে সারা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরা সম্ভব। তরুণদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে তারা শুধু রিল-নির্ভর ‘ভিউ জেনারেটর’ হিসেবে নয়, সত্যিকার অর্থে ‘ডিজিটাল পেশাজীবী’ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন।
সর্বোপরি, সমস্যাটা মনিটাইজেশন নয়—সমস্যাটা মনিটাইজেশনকে কীভাবে দেখা হচ্ছে। সমাজ যখন ভিউ-নির্ভর, মনোযোগ-নির্ভর মানসিকতা তৈরি করে ফেলে, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য—সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে কন্টেন্ট মনিটাইজেশন ভবিষ্যতের বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হতে পারে। তাই এখনই সময়, সমাজকে বাঁচাতে রিল নয়—বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা এবং দায়িত্বশীলতার দিকে একটু বেশি মনোযোগ দেওয়ার। কারণ, সবকিছু দিয়ে রিল বানানো যায়—কিন্তু একটি সমাজকে বাঁচাতে লাগে শুধু ভিউ নয়, সমষ্টিগত বিবেচনা ও নৈতিকতা।
লেখক : ড. ইকবাল আহমেদ,
কলামিস্ট ও অধ্যাপক,
কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।








আপনার মতামত লিখুন