কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমদাদুলের প্রশাসন ক্যাডার হয়ে ওঠার গল্প

রেজাল্টের রাত। মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই ঘুম ভাঙে এমদাদুল হক সরকারের। বন্ধুর কল—’রেজাল্ট শিট চেক কর’। ঘুম জড়ানো চোখে রেজাল্ট শিট খুলে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকেন স্ক্রিনের দিকে। নিজের রোল নম্বরের পাশে যখন ‘প্রশাসন ক্যাডার’ লেখা চোখে পড়ে, তখন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। কয়েকবার মিলিয়ে দেখার পরই ফোন করেন পরিবারকে। আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে পুরো পরিবার; এক কৃষক পরিবারের সন্তানের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে সেদিনই।
এই একটি মুহূর্তের পেছনে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা স্বপ্ন, ব্যর্থতা, সংগ্রাম আর নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতির গল্প। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এমদাদুল হক সরকার সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে সেই গল্পকেই বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন।

এমদাদুল হক সরকারের জন্ম কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার অন্তর্গত বামুটিয়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে। পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান হওয়ায় আদর-ভালোবাসার মাঝেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তবে আদরের আড়ালে ছিল দায়িত্ববোধের কঠোর পাঠ। বাবা-মা ছোটবেলা থেকেই এমদাদুলের পড়ালেখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, পাশাপাশি মানুষ হয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করার স্বপ্ন দেখাতেন। সেই শিক্ষাই ধীরে ধীরে তাঁর ভেতরে গড়ে তোলে দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
বাবার হাত ধরে মাত্র ছয় বছর বয়সে বামুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে এমদাদুলের শিক্ষাজীবনের সূচনা। পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি এবং অষ্টম শ্রেণিতে সাধারণ বৃত্তি অর্জন তাঁর মেধার স্বাক্ষর বহন করে। পরবর্তীতে মহিচাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর চান্দিনার রেদোয়ান আহমেদ কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি সম্পন্ন করে ভর্তি হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনে এমদাদুলকে নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়েছে। টিউশনির মাধ্যমেই চলত পড়াশোনা ও জীবনের প্রয়োজনীয় ব্যয়। কিন্তু এই বাস্তবতা তাঁকে দমিয়ে দেয়নি; বরং শিখিয়েছে সময় ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ববোধ ও আত্মনির্ভরতার পাঠ। সেই সময়ের নিয়মিত চর্চাই পরবর্তীতে বিসিএস প্রস্তুতিতে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
বিসিএসের স্বপ্ন এমদাদুলের মনে প্রথম দানা বাঁধে বড় ভাইয়ের হাত ধরেই। চাকরির প্রস্তুতির সময় বড় ভাইয়ের সংগ্রাম, পড়াশোনা ও শৃঙ্খলা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিসিএস ক্যাডার বড় ভাইদের গল্প, সাফল্যের অভিজ্ঞতা তাঁকে ভাবতে শেখায়, “আমি কেন পারব না?” সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত, বিসিএস দিতেই হবে, সরকারি চাকরিতেই নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই স্টাডি ফোরামের সহায়তায় গ্রুপ স্টাডি করতেন এমদাদুল। বড় ভাই ও শিক্ষকদের দিকনির্দেশনায় বই, সমসাময়িক বিষয়, পত্রিকা, সবকিছুই প্রস্তুতির অংশ ছিল। অনার্স শেষ করার পর বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করেন পুরোপুরি। করোনাকালীন সময়টাকে কাজে লাগিয়ে সিলেবাস বিশ্লেষণ, প্রশ্নব্যাংক স্টাডি এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা করায় গণিত ও বিজ্ঞানে সুবিধা পেয়েছেন। নিয়মিত পত্রিকা পাঠ ও লেখালেখির অভ্যাস লিখিত পরীক্ষায় বিশেষ সহায়ক হয়েছে। ভাইভার আগে গ্রুপ ডিসকাশন, সমসাময়িক ইস্যু অনুশীলন ছিল তাঁর প্রস্তুতির অন্যতম অংশ।
একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকাও এমদাদুলের প্রস্তুতিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব ও বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম, কুবি’র কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত সমসাময়িক বিষয়, রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও পাঠচর্চার সুযোগ পান। এসব বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা তাঁর বিশ্লেষণী দক্ষতা বাড়াতে এবং বিসিএস প্রস্তুতিকে আরও সুসংহত করতে সহায়তা করেছে।
২০২১ সালে অনার্স শেষ করার পর থেকেই এমদাদুল হক সরকার মূলত বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে শুরু করেন। প্রস্তুতির পাশাপাশি বাস্তব কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন ধাপে ধাপে। ২০২৩ সালে তিনি একটি এনজিওতে কমিউনিটি অর্গ্যানাইজার পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই বছর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।
এই সময়ের মধ্যেই বিসিএস যাত্রাটাও হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ৪৩তম বিসিএস ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বিসিএস, প্রিলিমিনারিতে ব্যর্থ হন, যদিও নম্বর ছিল কাছাকাছি। কিন্তু হতাশ না হয়ে আরও দৃঢ়ভাবে প্রস্তুত হন। পরবর্তীতে টানা তিনটি বিসিএসে প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হন। ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডারে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন এবং ৪৬তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হন। ব্যর্থতার সময়ে পরিবার, বিশেষ করে বড় ভাইয়ের সাহস জোগানো কথাই তাঁকে ভেঙে পড়তে দেয়নি।
প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন, এমনটাই জানান এমদাদুল। তিনি বলেন, ‘রেজাল্টের দিন রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এক বন্ধুর ফোনে ঘুম ভাঙ্গে এবং ঘুম ঘুম চোখে রেজাল্ট শীটের দিকে তাকাই, প্রথমে প্রশাসন ক্যাডারে নিজের রোল দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পরে কয়েক বার চেক করে নিশ্চিত হয়ে পরিবারকে বিষয়টি জানাই। তাঁরাও খবরটি শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।’
এই দীর্ঘ যাত্রায় পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বড়, এ কথা অকপটে স্বীকার করেন এমদাদুল। পাশাপাশি তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে অনুপ্রেরণা দেওয়া শিক্ষকদের প্রতি তাঁর বিশেষ কৃতজ্ঞতার। বিশেষভাবে স্মরণ করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন স্যারকে, যিনি ছোটবেলা থেকেই বিশেষ যত্ন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ ও জীবনের সঙ্গে যুক্ত সব শিক্ষাগুরুর প্রতিও তাঁর গভীর শ্রদ্ধা।
বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে এমদাদুলের পরামর্শ, ‘সিলেবাস ভালোভাবে বুঝে প্রশ্নব্যাংক বিশ্লেষণ করতে হবে, গণিত ও ইংরেজিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ফলাফলের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ও সাহিত্য পাঠ মানসিক প্রস্তুতিকে আরও দৃঢ় করে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এমদাদুল বলেন, ‘দেশের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করতে চাই। মানুষের জন্য কাজ করতে চাই মন-প্রাণ উজাড় করে, যেন একজন মানবিক প্রশাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। সেই লক্ষ্য পূরণে আমি সবার দোয়া কামনা করি।’








আপনার মতামত লিখুন