পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

জীববৈচিত্র্যের সন্নিবেশ ও সমাহারে সৃষ্ট প্রকৃতি ও প্রতিবেশের ওপর ভিত্তি করেই টিকে আছে আমাদের জীবন। নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, বনভূমি, জলাভূমি, উদ্ভিদ ও প্রাণীর পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় গড়ে উঠেছে পৃথিবীর জীবজগৎ। কিন্তু মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ প্রকৃতি ও প্রতিবেশ গভীর সংকটের মুখে। বন উজাড়, নদীদূষণ, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। এ সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ।
প্রকৃতি মানুষের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় সম্পদের অন্যতম উৎস। বনভূমি জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে, নদী ও জলাভূমি অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে এবং উদ্ভিদ-প্রাণীর পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিবেশব্যবস্থাকে সচল রাখে। এই ব্যবস্থার কোনো একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব অন্য অংশগুলোর ওপরও পড়ে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়ে।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস পরিবেশগত সংকটকে আরও তীব্র করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়াতে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির উদ্যোগে ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। তবে পরিবেশ রক্ষাকে কেবল দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও বেশি। নদীমাতৃক এ দেশে নদীদূষণ, বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৫৪ লাখ বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। রোপিত গাছের পরিচর্যা ও সুরক্ষার পাশাপাশি পাহাড় কাটা বন্ধ, বনভূমি দখল রোধ এবং দখল হয়ে যাওয়া বনভূমি উদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য বাস্তবায়নে গাছের পরিচর্যা ও টিকে থাকার হার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু গাছ লাগানো নয়, প্রাকৃতিক বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ধলেশ্বরী নদীর দূষণ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৪২৪টি পয়েন্ট থেকে এসব নদীতে দূষণ হচ্ছে। নদীদূষণ রোধে বর্জ্য পরিশোধনব্যবস্থা কার্যকর করা, দূষণের উৎস বন্ধ করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়ানো, সৌরবিদ্যুতের প্রসার, সবুজ অর্থায়ন এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের ব্যবহার পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগ ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেই শুরু হতে পারে। দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রকৃতি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি, আর প্রতিবেশের ভারসাম্য আমাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কার্যকর আইন প্রয়োগ, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, জনসচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রকৃতি বাঁচলে জীববৈচিত্র্য বাঁচবে, সুরক্ষিত হবে মানুষের জীবন এবং নিরাপদ হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পৃথিবী।






আপনার মতামত লিখুন